পরিবারগুলোর অভিযোগ, কয়েকটি অভিযান গভীর রাতে চালানো হয়। এ সময় অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, রিমান্ড আদেশ বা এফআইআরের কপি দেখায়নি। এমনকি আটক করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভারতীয় নাগরিকত্বের নথি উপস্থাপনের যথেষ্ট সুযোগও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা।

মুর্শিদাবাদের ৬১ বছর বয়সী ইব্রাহিম শেখকে গত ২৯ জুলাই রাত সাড়ে ১২টার দিকে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয় বলে তার পরিবারের দাবি। স্বজনদের ভাষ্য, ইব্রাহিম আধার ও ভোটার পরিচয়পত্র দেখালেও তাকে আটক করা হয়। পরে তাকে একটি ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে বলে পরিবার জানতে পারে। এরপর তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে বলে দাবি স্বজনদের।

উত্তর দিনাজপুরের ৬৭ বছর বয়সী জলিল আখতারকেও বাড়ির বাইরে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তার পরিবারের দাবি, জলিল ভারতীয় নাগরিক এবং একাধিক নির্বাচনি ভোটার তালিকায় তার নাম রয়েছে। এমনকি ২০২৬ সালের ভোটার তালিকাতেও তার নাম থাকার কথা জানিয়েছে পরিবার। তবে পুলিশের অভিযোগ, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক।

আরেক ঘটনায় আবদুল জব্বারকে তার দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেসহ আটক করা হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। স্বজনদের দাবি, আবদুলের কাছে ভারতীয় পাসপোর্ট, ভোটার পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন সরকারি নথি রয়েছে। তাকে আটকের পর তার স্ত্রী খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন বলেও পরিবার জানিয়েছে।

আটক ব্যক্তিদের কয়েকজন সাম্প্রতিক নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন বলে পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত চারজন নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার যাচাইও সম্পন্ন করেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।

আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ

আটকের ধরন ও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে মানবাধিকারকর্মী এবং আইনজীবীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মুর্শিদাবাদভিত্তিক অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটসের কর্মী জাকির হোসেনের অভিযোগ, কিছু ব্যক্তিকে আদালতে হাজির না করেই আটক রাখা হচ্ছে।

অন্তত একটি ঘটনায় আটক এক ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই ব্যক্তি নিজেকে ভারতীয় নাগরিক দাবি করলে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাকে ফিরিয়ে দেয় বলে জানা গেছে। পরে তার বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫-এর অধীনে মামলা করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আটক ব্যক্তিদের পরিবারের প্রশ্ন, ভোটার পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, জমির নথি ও অন্যান্য সরকারি কাগজপত্র থাকা ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে তাদের কেন কার্যকর আইনি সুযোগ দেওয়া হবে না। তাদের দাবি, নাগরিকত্ব নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।

পশ্চিমবঙ্গে কথিত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও আটকের কার্যক্রম জোরদার হওয়ার মধ্যে এসব ঘটনা বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের আচরণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে অধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন।

তারা ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে কতজনকে রাখা হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের আইনি অবস্থান কী এবং নাগরিকত্ব নির্ধারণে কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।

তবে এসব অভিযোগ মূলত বিভিন্ন ব্যক্তি ও পরিবারের বক্তব্য এবং স্ক্রলের অনুসন্ধানে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আটকের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বক্তব্য প্রতিটি ঘটনায় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

সূত্র: মুসলিম মিরর ও স্ক্রল ডট ইন

এস