স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার রাতেও মসজিদ প্রাঙ্গণে মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। কয়েক সপ্তাহ ধরে এলাকার মুসলিমরা সম্ভাব্য উচ্ছেদ ও আংশিক ভাঙার আশঙ্কায় মসজিদের ভেতরে অবস্থান করছেন। তাদের বক্তব্য, মসজিদ রক্ষার জন্য শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করা ছাড়া আপাতত তাদের সামনে আর কোনো পথ নেই।
ইন্দোরের বিশিষ্ট ইসলামি আলেম মুফতি জুনাইদ মাকতুবকে বলেন, প্রশাসন বিরোধ চলমান থাকা অবস্থায় মসজিদের একাংশ ভাঙার উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করলে মুসলিমরা সেখানে জড়ো হন। তাঁর দাবি, একটি মসজিদ ভাঙা হলে উজ্জয়নের আরও বহু পুরোনো মসজিদ একই ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, ‘এই মসজিদটি ভেঙে ফেলা হলে আরো ২৮টি মসজিদ একই তালিকায় চলে আসবে এবং লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। কোনো স্থাপনা কোনো প্রকল্পের পথে পড়েছে—শুধু এই কারণে একের পর এক মসজিদ ভেঙে ফেলা যায় না।’
মুফতি জুনাইদ আরো অভিযোগ করেন, একটি ধর্মীয় স্থাপনার উন্নয়ন বা সুবিধা নিশ্চিত করতে গিয়ে অন্য ধর্মের উপাসনালয়ের অস্তিত্ব মুছে ফেলার উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়। তার দাবি, উজ্জয়নে বড় হিন্দু তীর্থযাত্রা আয়োজনকে সামনে রেখে শহরের অবকাঠামো পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বেশ কয়েকটি পুরোনো মসজিদ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
উজ্জয়নে ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভ মেলা সামনে রেখে সড়ক সম্প্রসারণের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় খাজর ওয়ালি মসজিদ থেকে গণেশ চৌক পর্যন্ত প্রায় ৭৩০ মিটার সড়ক সম্প্রসারণ করে ১৫ মিটার প্রশস্ত পথ তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। মাকতুবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পে মোট ২৭২টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
শাহী মসজিদের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ভাঙার মধ্যে রয়েছে নামাজের হল বা জামাতখানার একটি অংশ, প্রায় ১২০ ফুট উচ্চতার একটি মিনার এবং মাজার চৌক শাহী নামে পরিচিত অংশ। মুসলিম পক্ষের দাবি, এসব স্থাপনা মসজিদের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় কাঠামোর অংশ এবং এগুলোর আংশিক অপসারণও মসজিদের অস্তিত্ব ও ঐতিহ্যের ওপর প্রভাব ফেলবে।
তবে বিষয়টি এখন আদালতের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেও রয়েছে। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট সম্প্রতি উজ্জয়েন পৌর করপোরেশনের জারি করা ভাঙার নোটিশ চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা দুটি আবেদন খারিজ করেছে। বিচারপতি সন্দীপ এন ভাট বলেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধান অনুসারেই নেওয়া হয়েছে এবং মসজিদ পরিচালনাকারীদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগও দেওয়া হয়েছিল।
অর্থাৎ হাইকোর্টের রায়ে প্রশাসনের প্রস্তাবিত পদক্ষেপকে আইনগত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে মুসলিম পক্ষ এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি।
অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটসের আইনজীবী জায়েদ পাঠান বলেন, নুমাইন্দা কমিটি তাদের আইনজীবীর মাধ্যমে হাইকোর্টের রায় চ্যালেঞ্জ করে ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
তিনি বলেন, আপাতত মুসলিমরা সম্মিলিত সিদ্ধান্তে মসজিদের ভেতরে অবস্থান করছেন। তাদের উদ্দেশ্য হলো প্রস্তাবিত ভাঙার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো এবং মসজিদটি রক্ষা করা। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মুসলিমরা মনে করছেন, মসজিদের সামনে অবস্থান করাই বর্তমানে সেটিকে ভাঙার উদ্যোগ ঠেকানোর একটি উপায়।
উজ্জয়নের এই ঘটনাকে ঘিরে মূল বিরোধটি তৈরি হয়েছে নগর উন্নয়ন ও ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষার প্রশ্নে। প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভকে সামনে রেখে মহাকালেশ্বর মন্দিরের আশপাশে তীর্থযাত্রীদের চলাচল সহজ করতে সড়ক প্রশস্ত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে মুসলিমদের বক্তব্য, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনার ক্ষতি এড়ানোর বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করা উচিত।
বর্তমানে মসজিদের বাইরে বুলডোজার অবস্থান এবং ভেতরে মুসল্লিদের অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হলেও, বিষয়টির পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করছে সুপ্রিম কোর্টে মুসলিম পক্ষের আইনি চ্যালেঞ্জের ওপর। আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনের পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে ঐতিহাসিক শাহী মসজিদের বিতর্কিত অংশ শেষ পর্যন্ত অপসারণ করা হবে কি না।
এমএম











