ট্রাম্পের ঘোষিত ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ অভিযানের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর ঘোষণা দেন। ইরানকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করা দেশগুলোকে ‘ব্যাপক অর্থনৈতিক পরিণতি’ ভোগ করতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

তেল পাচার, অর্থ স্থানান্তর, নগদ অর্থ লেনদেন, মানি এক্সচেঞ্জ, জাহাজ নিবন্ধন ও বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইরানকে সহায়তার বিষয়গুলো বন্ধ করার আহ্বান জানান ট্রাম্প।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, চীন ও রাশিয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক চাপ কার্যকর করা সহজ হবে না। রাশিয়া ইতোমধ্যে ব্যাপক মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে এবং অনেকাংশে পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে চীন নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে প্রয়োজন হলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার নজিরও দেখিয়েছে।

কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সরকারের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ মনে করেন, ট্রাম্পের এই চাপের অভিযান বাস্তবায়ন করা ‘খুবই কঠিন’ হবে। তার মতে, এ ধরনের সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে চীন, রাশিয়া ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের সমর্থন প্রয়োজন।

এর আগে একই দিন সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার ইউএই দীর্ঘদিন ধরে দেশটির পণ্য আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের অন্যতম পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।

তবে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের রপ্তানি করা তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ কিনেছে চীন।

চীনের তেল শোধনাগারগুলোর ওপর মার্কিন চাপ সৃষ্টি করাও কঠিন হতে পারে। কারণ দেশটির অধিকাংশ শোধনাগার স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয় এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তাদের নির্ভরতা তুলনামূলক কম।

ইরানের অর্থ লেনদেন প্রক্রিয়াজাত করা চীনা বড় ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে এমন পদক্ষেপ চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।

চীন ও এশিয়া-প্যাসিফিকবিষয়ক গবেষক ইউ জি বলেন, ইরানের অর্থনৈতিক অংশীদারদের লক্ষ্য করে ট্রাম্পের হুমকি চীনের সঙ্গে ইরানের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক বা সম্পৃক্ততায় বড় পরিবর্তন আনবে না।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ানও বলেছেন, আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সমস্যার সমাধান হবে না। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়া এবং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের আগামী মাসে ওয়াশিংটন সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রও চীনের সঙ্গে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

রাশিয়ার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ইরানের সঙ্গে চীনের তুলনায় রাশিয়ার বাণিজ্য কম হলেও মস্কো ও তেহরান কয়েক বছর ধরে পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা দুই দেশ ২০ বছরের একটি অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে। রাশিয়ার জ্বালানিমন্ত্রী সের্গেই তসিভিলেভের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে ৪৮০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।

এ ছাড়া ক্যাস্পিয়ান সাগর দিয়ে দুই দেশের মধ্যে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিনিময়ের খবরও রয়েছে। সম্প্রতি একটি ইউরোপীয় সরকারের নথির বরাত দিয়ে এনবিসি নিউজ জানায়, রাশিয়া সমুদ্রপথে ইরানে ড্রোনের যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদ ও টিএনটি পাঠিয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ট্রাম্পের অর্থনৈতিক অভিযানের নিন্দা করে এটিকে ওয়াশিংটনের ‘ব্যর্থ নীতির’ ধারাবাহিকতা বলে মন্তব্য করেছেন। তার দাবি, এ নীতি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আরও পরাজয় ডেকে আনবে।

এদিকে, পশ্চিমা বাজারের বাইরে বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্রিকসকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে ইরান। রাশিয়া, চীন, ভারত ও ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে গঠিত এই জোটের মাধ্যমে নতুন অর্থায়ন ও নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে তেহরান।

ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি জানিয়েছেন, ইরান ব্রিকস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (এনডিবি) যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এতে পশ্চিমা বাজারের বাইরে অর্থায়নের সুযোগ বাড়তে পারে বলে মনে করছে তেহরান।

তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলি আকবর দারেইনি বলেন, কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নেবে। তার ভাষায়, ট্রাম্প এমন এক যুদ্ধে আটকে আছেন, যা তিনি জিততে পারবেন না এবং যেখান থেকে বেরও হতে পারছেন না।

এস