চতুর্থ দিনেও জীবিতদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে উত্তর নেপালের বিভিন্ন এলাকায় আবারও ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারীদের পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত, হেলিকপ্টারে উদ্ধার
বন্যার পানির স্রোতে প্রধান সড়ক ও সেতুগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফলে দুর্গত এলাকাগুলোতে স্থলপথে পৌঁছাতে পারছেন না উদ্ধারকর্মীরা।
বেঁচে যাওয়া মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। নেপালের উদ্ধারকারী দল এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষকে দুর্গত এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে।
ত্রিশূলি এলাকায় আরও বন্যার আশঙ্কায় স্থানীয়দের সতর্ক করা হয়েছে।
তিব্বতে ৭ জন নিহত, নিখোঁজ ৫৫৪
বন্যার প্রভাবে চীনের তিব্বত অংশেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে এখন পর্যন্ত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
আগামী কয়েকদিন ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস থাকায় তিব্বতে উদ্ধার কার্যক্রমেও বাধা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সম্ভাব্য ভূমিধসের ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
অন্যদিকে, নেপাল থেকে বয়ে যাওয়া নদীগুলোতে সাতটি মরদেহ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ভারতের কর্তৃপক্ষ। মরদেহগুলো বন্যায় নিখোঁজ বা নিহত ব্যক্তিদের বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে অনেকে
নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছে সুড়ঙ্গে বেশ কয়েকজন আটকা পড়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের উদ্ধারে শনিবার সকাল থেকে সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখের ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ জোরদার করা হয়েছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিখোঁজের তালিকায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায় কর্মরত ৯৩৩ জনের নাম যুক্ত করেছে।
রসুয়ায় ত্রিশূলি-৩ ‘এ’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ ও নেপাল পুলিশের যৌথ দল কাজ করছে। তবে সুড়ঙ্গের ভেতরে ঠিক কতজন রয়েছেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বন্যার পর থেকেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
এদিকে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য একটি ভারতীয় দলও ত্রিশূলিতে পৌঁছেছে।
স্যাটেলাইট ছবিতে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ
বন্যার আগে ও পরের স্যাটেলাইট ছবি থেকে নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী বিভিন্ন শহর ও গ্রামের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র উঠে এসেছে।
তিমুরে এলাকায় আগে নদীর তীর ঘেঁষে অসংখ্য ভবন দেখা গেলেও বন্যার পর সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি স্থাপনা টিকে আছে। বিস্তীর্ণ এলাকা কাদা, পানি ও পাথরের স্তূপে ঢেকে গেছে।
ত্রিশূলি নদীর তীরে অবস্থিত রসুয়াগড়ী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের এলাকাতেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে।
চিতওয়ানে ২৩৩ মরদেহ, শনাক্ত মাত্র ৪
বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত চিতওয়ান এলাকায় এ পর্যন্ত ২৩৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র চারজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
বাকি ২২৯টি মরদেহ বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টার ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে রাখা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকায় অনেক মরদেহ পচে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রশাসন জানিয়েছে, প্রতিটি মরদেহের কোড নম্বর অনুযায়ী ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে রেকর্ড রাখা হবে। এরপর শনাক্ত না হওয়া ও দাবিহীন মরদেহগুলো নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় দাফন বা সৎকারের ব্যবস্থা করা হবে।
কেন এত পর্যটক ছিলেন ওই এলাকায়?
নেপাল ও তিব্বতের এই অঞ্চলটি হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তীর্থস্থান। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ ধর্মীয় উদ্দেশ্যে এসব এলাকায় ভ্রমণ করেন।
নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা বেশি বলে জানা গেছে। অনেক ভারতীয় তীর্থযাত্রী নেপাল হয়ে তিব্বতের কৈলাশ পর্বতের দিকে যান। হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে প্রায় ৬ হাজার ৪০০ মিটার উঁচু কৈলাশ অত্যন্ত পবিত্র।
তবে শুধু তীর্থযাত্রী নয়, নেপাল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্বতারোহী ও ট্রেকারদের কাছেও জনপ্রিয়। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত উত্তর-মধ্যাঞ্চলের রাসুয়া অঞ্চলও ট্রেকিংয়ের জন্য পরিচিত।
বন্যার সময় সেখানে পর্যটক ও পর্বতারোহীদের উপস্থিতি ছিল বলে ধারণা করছে কর্তৃপক্ষ।
তথ্য নিয়ে কিছুটা অসঙ্গতি
বন্যার পর হতাহত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা একাধিকবার হালনাগাদ করা হয়েছে। নেপাল পুলিশ ও জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া পরিসংখ্যানেও কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে।
উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় মৃত, নিখোঁজ ও উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় নির্ভুল তথ্য সংগ্রহে সময় লাগছে।
তিব্বতের পরিস্থিতি সম্পর্কেও স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই করা কঠিন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। সেখানে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়ায় অনেক তথ্য চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করে প্রকাশ করা হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা, এপি
এস