বুধবার (৫ আগস্ট) সংশ্লিষ্ট পাঁচটি সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর তেহরান একাধিক উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। সেই ধারাবাহিকতায় উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে কঠোর বার্তা পৌঁছে দেয় ইরান।

বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুইজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা, উপসাগরীয় অঞ্চলের দুটি কূটনৈতিক সূত্র এবং একজন আঞ্চলিক কূটনীতিকের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পাশাপাশি পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গেও পৃথকভাবে আলোচনা করেছেন।

আলোচনায় আরাঘচি ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ উপসাগরীয় মিত্রদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো হামলা হলে তার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা, স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পদ এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে তেহরান। এতে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেয় ইরান।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন যে, সম্ভাব্য যেকোনো হামলার জবাব দিতে তেহরান প্রস্তুত রয়েছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় ধরনের সংঘাত ও ধ্বংসযজ্ঞ এড়াতে সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং কূটনৈতিক সংলাপই সবচেয়ে কার্যকর পথ।

সূত্রগুলোর দাবি, আরাঘচি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি উত্তেজনা প্রশমনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তার মতে, পারস্পরিক সংযম, আলোচনা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমেই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব; অন্যথায় নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জ্বালানি খাতের ওপর পড়তে পারে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের সতর্কবার্তা ছিল দ্ব্যর্থহীন। আমেরিকা যদি ইরানের অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে, তবে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে এর প্রতিশোধ নেবে।

জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ও উপসাগরীয় সূত্র জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান পরবর্তীতে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি ট্রাম্পকে সামরিক পদক্ষেপ বিলম্বিত করতে, আলোচনায় ফিরতে, যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে আহ্বান জানিয়েছেন।

আরেকটি উপসাগরীয় সূত্র জানিয়েছে, সতর্কবার্তাটি প্রতিটি উপসাগরীয় রাষ্ট্রের জন্যই ছিল। তবে এটি মূলত সৌদি আরব ও কাতারের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান তার সাবেক আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করেছে।

ইরানের আরেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন করে মার্কিন হামলা এ অঞ্চলকে নরকে পরিণত করতে পারে বলে তেহরান সতর্ক করেছে। এরপর কাতার, ওমান ও সৌদি আরব সবাই ওয়াশিংটনকে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করতে এবং নতুন করে সংঘাত এড়াতে আহ্বান জানিয়েছে।

এর আগে গত ২ আগস্ট ট্রাম্প বলেন, দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর শর্তে তিনি ইরানের ওপর হামলার পরিকল্পনা বাতিল করতে রাজি হয়েছেন।

উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি সূত্র জানিয়েছে, উত্তেজনা আরও বাড়লে তা কেবল আরও ধ্বংসযজ্ঞই ডেকে আনবে বলে মনে করছে সৌদি আরব। এজন্য দেশটি ট্রাম্পকে কূটনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।

ওয়াশিংটনকে কূটনৈতিক পথ অনুসরণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি রিয়াদ জানিয়েছে, হুমকির মুখে পড়লে তারা আত্মরক্ষা করবে।

দ্বিতীয় আরেকটি উপসাগরীয় সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরব সতর্ক করেছে যে, তাদের ভূখণ্ডে যেকোনো হামলার সামরিক জবাব দেওয়া হবে।

এদিকে ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো বন্ধ করার দাবি বারবার জানিয়েছে। তারা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ করার আহ্বানও জানিয়েছে। তেহরানের দাবি, এসব গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই ইরানে হামলা চালানো হচ্ছে।

ইরানের এক কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো নতুন হামলার জবাবে উপসাগরজুড়ে জ্বালানি স্থাপনা, শোধনাগার, বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি সরবরাহ অবকাঠামো, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং তেলক্ষেত্রে হামলা চালানো হবে বলে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, শত্রুপক্ষ ইরানের অবকাঠামোকে ক্রমাগত হুমকি দিয়ে চলেছে। ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর জবাবে তারা আরও বড় ক্ষতি করবে।

এনএইচ