ময়নাতদন্তের রিপোর্টে বলা হয়েছে, কিশোরীর ফুসফুসে কাদা পানি পাওয়া গেছে। খুন করার পর লাশ পানিতে ফেলা হলে যেটা হওয়ার কথা নয়। ডুবে মৃত্যু হলেই ফুসফুসে পানি পাওয়া যায়। ফলে কিশোরীকে যখন পানিতে ফেলা হয়, তখনও সে বেঁচে ছিল বলেই পুলিশের অনুমান। তবে তার আগে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল সে।
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট বলছে, কিশোরীর যৌনাঙ্গে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ক্ষত রয়েছে মাথাতেও, যা ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করার কারণে বা শক্ত কোনো জায়গায় ঠুকে দেওয়ার কারণে হতে পারে। এই আঘাত থেকে প্রচুর পরিমাণ রক্তপাত হয়েছিল বলে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং পানিতে ডুবে শ্বাসরোধ—মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে এই দুটি বিষয়ের উল্লেখ করেছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকেরা। শনিবার গভীর রাতে ওই কিশোরীর মৃত্যু হয় বলে চিকিৎসকদের ধারণা।
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট, সিসিটিভি ফুটেজ এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বয়ান মিলিয়ে তদন্তকারীরা গোটা ঘটনা পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করছেন। এখনও পর্যন্ত যা তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে বলে সন্দেহ জোরালো হচ্ছে তাঁদের।
পুলিশের হাতে যে সিসিক্যামেরা ফুটেজ হাতে এসেছে, তাতে শনিবার বিকেল ৪টা ৪১ মিনিটে সূর্যপুর বাজারের মূল রাস্তা দিয়ে ওই কিশোরীকে হেঁটে যেতে দেখা যাচ্ছে। তার কয়েক কদম পিছনে লাল টি শার্ট পরে যাচ্ছেন এক যুবক। এই ফুটেজ দেখেই ওই যুবককে প্রভাস মণ্ডল বলে চিহ্নিত করেন স্থানীয়রা। এরপর রোববার সকাল সাতটা নাগাদ প্রায় এক কিলোমিটার দূরের একটি পুকুর থেকে কিশোরীর লাশ উদ্ধার হয়।
প্রভাস এলাকায় মাদকাসক্ত বেকার যুবক হিসেবেই পরিচিত। তাঁকে জেরা করে এই ঘটনায় যুক্ত বাকিদের নাম জানতে পারে পুলিশ। তবে জেরায় প্রভাস যা বলেছেন, তাতেও অসঙ্গতি বিস্তর। প্রথমে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছিলেন। পরে পুলিশকে জানান, চার জন তাঁর কাছ থেকে ওই কিশোরীকে নিয়ে চলে যান। এঁদের মধ্যে একমাত্র আনন্দ সর্দারকেই তিনি চেনেন। আনন্দ কিশোরীকে অপহরণ করে তার বাবার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ চাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন বলেও দাবি করেন প্রভাস।
প্রভাস এখনও পর্যন্ত বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে বলেই তদন্তকারীদের ধারণা। প্রভাস জেরায় দাবি করেছেন, আনন্দই শ্বাসরোধ করে ওই কিশোরীকে খুন করেছেন। প্রশ্ন হলো, প্রভাস যদি ঘটনাস্থলে না-ই থেকে থাকেন, তা হলে কে, কীভাবে খুন করেছে, সেটা তিনি জানলেন কী করে? একই সঙ্গে কোথায় লাশ ফেলা হয়েছে, সেটাও বা তিনি কী করে জানলেন?
শুধু প্রভাস নয়, গ্রেপ্তার বাকিদের বয়ানেও একই রকম অসঙ্গতি রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্য মিলিয়ে পুলিশের অনুমান, অভিযুক্তরা ঘটনার সময় নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন। যৌন নির্যাতনের পর কিশোরীকে খুন কেন করা হলো, তা নিয়ে দুটি সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। এক, নির্যাতিতা এবং অভিযুক্তরা সকলেই একই এলাকার বাসিন্দা। ফলে ওই কিশোরী হয়তো অভিযুক্তদের হয়তো চিনতে পেরেছিল। তাই প্রমাণ লোপাট করতে খুন করা হয়।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা হল, শনিবার রাত আটটা থেকে নির্যাতিতার খোঁজ শুরু হয়ে যায়। সেই খবর অভিযুক্তদেরও কানে যায়। ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই খুন করার জন্য তার মাথায় আঘাত করা হয়। পরে সুযোগ বুঝে লাশ ফেলে দেওয়া হয় পুকুরে। তদন্তকারীদের ধারণা, মাথার আঘাত গুরুতর হলেও পুকুরে ফেলার সময়েও বেঁচে ছিল ওই কিশোরী। অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। সেই অবস্থাতেই তাকে বস্তাবন্দি করে পুকুরে ফেলা হয়। নির্যাতিতার এক প্রতিবেশীর বক্তব্য, ‘তার দিয়ে বাঁধা বস্তাটা ছেঁড়া ছিল। নিশ্চয়ই বের হওয়ার একটা শেষ চেষ্টা করেছিল মেয়েটা।’
এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা। তারা বলেছেন, শুভেন্দু অধিকারী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মুসলিমদের ক্রমশ দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে ট্রিট করছে সরকার। হিন্দু যুবকরা মুসলিম নাবালিকাকে গণধর্ষণের পর খুন করে পুকুরে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় বিচার চাইতে সংঘবদ্ধ হলে উল্টো মুসলিমদের আটকাচ্ছে পুলিশ। অনেক মুসলিম বলেছেন, ‘আমরা কি ন্যায়বিচারের দাবিও জানাতে পারব না?’
এস