চার দিন ধরে মহাসড়কে অশেষ দুর্ভোগ সহ্য করছেন বাসের যাত্রীরা। টার্মিনালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর বাস মিললেও মহাসড়কে দিনভর যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে তাদের। নদী পার হতে ফেরিঘাটেও দীর্ঘ যানজটে নাকাল ঘরমুখো মানুষ।

এসবের মাঝেও কিছুটা স্বস্তি ছিল ট্রেনে। কিন্তু গতকাল রোববার সিডিউল বিপর্যয়ে ট্রেনের যাত্রীদেরও দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। তবুও লাখ লাখ মানুষ শত দুর্ভোগ মেনেই নাড়ির টানে বাড়ি ফিরে গেছেন।

বিকেল ৫টায় কমলাপুর স্টেশনে কথা হয় রাজশাহীগামী সিল্কসিটি আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রী নকিবুল ইসলামের সঙ্গে। দুই বন্ধুর সঙ্গে পত্রিকা বিছিয়ে প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছেন তিনি। জানালেন দুপুর দেড়টায় স্টেশনে এসেছেন। ২টা ৪০ মিনিটে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল সিল্কসিটির। কিন্তু বিকেল ৫টায়ও ট্রেনের দেখা নেই। পাশ দিয়েই যাচ্ছিলেন স্টেশন মাস্টার নৃপেন সাহা। তিনিও বলতে পারলেন না, কখন আসবে ট্রেন।

স্টেশন মাস্টার জানান, ট্রেনে যত আসন আছে, তার চারগুণ যাত্রী যাচ্ছেন। এ কারণে নির্ধারিত গতিতে ট্রেন চলতে পারছে না। তাই ঢাকায় ফিরতে দেরি হচ্ছে ট্রেনগুলোর। নৃপেন সাহা জানান, সকালের দিকে ট্রেনগুলো বিলম্ব করলেও বিকেলে যমুনা এক্সপ্রেস, সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস ও ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ঠিক সময়ই গেছে।

সকালে ঢাকা-সিলেট রুটের পারাবত এক্সপ্রেস, ঢাকা-খুলনা রুটের সুন্দরবন এক্সপ্রেস পথে বিকল হয়ে পড়লে সিডিউল বিপর্যয় ঘটে। আড়াই ঘণ্টা বন্ধ থাকে ট্রেন চলাচল।

 কমলাপুর থেকে ১১টি ট্রেন ছেড়ে যেতে বিলম্ব হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েন হাজারো যাত্রী। স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী জানান, সকাল পৌনে ৭টায় কমলাপুর থেকে ছেড়ে যায় পারাবত এক্সপ্রেস। এর ১৫ মিনিট পর অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে ট্রেনটির দুটি কোচের (বগি) এয়ারপ্রেসার ব্রেক আউট হয়ে যায়। বিমানবন্দর স্টেশনে একই সমস্যা পড়ে সুন্দরবন এক্সপ্রেস। আড়াই ঘণ্টা পর সকাল পৌনে ১০টার দিকে ট্রেন দুটির এয়ারব্রেক ঠিক করা হয়।

কমলাপুর স্টেশনের কর্মকর্তারা জানান, এ স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগের লাইন বিকল হওয়ায় অন্যান্য ট্রেনও পথে আটকা পড়ে। পারাবতের পেছনে আটকা পড়ে থাকে সকাল ৭টায় কমলাপুর ছেড়ে যাওয়া ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সোনার বাংলা এক্সপ্রেস। তেজগাঁও স্টেশনে আটকা পড়ে ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ রুটের তিস্তা এক্সপ্রেস। চারটি ট্রেন পথে আটকা পড়ায় ১১টি ট্রেন ছাড়তে দুই থেকে তিন ঘণ্টা বিলম্ব হয়।

এদিকে, গত বৃহস্পতিবার থেকেই মহাসড়কে যানবাহন চলছে থেমে থেমে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৫ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা। ঢাকা থেকে দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের পথের অবস্থা আরও খারাপ। ৫ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে দুই থেকে তিনগুণ সময় তো লাগছেই, তার আগে বাসের অপেক্ষায় টার্মিনালে বসে থাকতে হচ্ছে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা। গতকালও ছিল একই অবস্থা।

শনিবার রাত ১১টায় তার বাস ছাড়ার কথা ছিল। কাউন্টার থেকে তাকে জানানো হয়, যানজটের কারণে বাস ঢাকায় ফিরতে পারছে না। রোববার বেলা ১১টায় বাস ছাড়বে। কিন্তু ১২ ঘণ্টা পরও বাস পাননি তিনি। সকালে তাকে জানানো হয়, বিকেল ৬টায় বাস ছাড়বে। রাত ৯টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় ২২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও বাসের দেখা মেলেনি।

অভিন্ন চিত্র ছিল উত্তরবঙ্গের যাত্রীদের। বগুড়ার কেয়া পরিবহনের আগাম টিকিট কেটে শনিবার কাউন্টারে এসে বগুড়ার যাত্রী শাহীন ইসলাম জানতে পারেন, যানজটের কারণে তার বাস পিছিয়ে গেছে ২৬ ঘণ্টা। শনিবার সকাল ৮টায় বাস ছাড়ার কথা থাকলেও গতকাল সকাল ১০টায়ও বাসের দেখা পাননি।

বাস কাউন্টারের কর্মকর্তারাও বলছেন, এমন যানজট তারাও কখনও দেখেননি। কেয়া পরিবহনের কল্যাণপুর কাউন্টারের কর্মকর্তা ইসমাইল খান অভিযোগ করেন, মহাসড়কে গরুর হাট ও চাঁদাবাজির কারণে রাস্তায় যানজট। তিনি বলেন, 'বাসে-ট্রাকে অবাধে চাঁদাবাজি হচ্ছে। কিন্তু প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।' তিনি জানান, গত শুক্রবার রাত ৯টায় দিনাজপুরের হিলি উদ্দেশে যে বাস ঢাকা থেকে ছেড়ে গেছে, তা ফিরে এসেছে গতকাল সকাল ১০টায়। আসা-যাওয়ায় ৩৭ ঘণ্টা সময় গেছে। ইসমাইল খান বলেন, 'মন্ত্রী বলছেন রাস্তায় নাকি যানজট নেই! কিন্তু ঈদে এ রকম জ্যাম আর এমন চাঁদাবাজি আমি আর দেখিনি।'

গতকাল ভোরের দিকে কালীহাতি উপজেলায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণে মহাসড়ক দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় যানজট সৃষ্টি হয়। আগের তিন দিনের মতোই এদিন মহাসড়কে থেমে থেমে গাড়ি চলেছে।

স্থানীয়রা জানায়,  ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা এলাকায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট ছিল। যানজট ছাড়লেও যানবাহন চলেছে ধীরে ধীরে। হাইওয়ে পুলিশের সালনা থানার ওসি হোসেন সরকার জানান, গাড়ির চাপের কারণে বিভিন্ন পয়েন্টে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল গাজীপুরের শিল্প কারখানার একাংশ ছুটি হয়। হাজার হাজার শ্রমিক পড়েন যানবাহনের সংকটে।

এসএ