বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিতে জড়িত থাকার অভিযোগে ফিলরেমসহ রেমিট্যান্স আদান প্রদানকারী ৩ অর্থ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করেছে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিএসপি।লাইসেন্স বাতিল হওয়া অন্য প্রতিষ্ঠান দুটি হল ওয়েরকুইক ও পেসো রেমিট্যান্স এক্সপ্রেস।
বিএসপির বরাত দিয়ে ফিলিপাইনের অনলাইন পত্রিকা কনসেপ্ট নিউজ সেন্ট্রাল জানায়, অর্থ পাচারে সহযোগিতার অভিযোগে রেমিট্যান্স এজেন্ট, মানি এক্সচেঞ্জার ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী হিসেবে এই তিন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সে বাতিল করা হয়েছে।বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাবে বিএসপি।
এদিকে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট বা হিসাব থেকে ৮০ মিলিয়ন ডলার চুরি হওয়ার ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে মার্কিন কংগ্রেসের একটি কমিটি।
সিএনবিসি জানায়, কংগ্রেসের হাউস অব সায়েন্স কমিটির চেয়ারম্যান লামার স্মিথ মঙ্গলবার নিউইয়র্ক ফেডের প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ডাডলির কাছে এক চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ চুরির ঘটনাসংক্রান্ত ‘সব কাগজপত্র এবং যোগাযোগ তথ্য’ চেয়ে পাঠান।কমিটি নিউইয়র্ক ফেডের কাছে এ-ও জানতে চেয়েছে যে সুইফট (সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ড ইন্টার ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন) সিস্টেমে কোন ত্রুটি ছিল কি না? ১৪ জুনের মধ্যে এই কাগজপত্র দিতে বলা হয়েছে।
পাল্টা পাল্টি দোষারোপ
ভারতীয় হ্যাকাররা
ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা পরিকল্পনাকারী ভারতভিত্তিক এবং তাদেরকে খুঁজে বের করা বা ধরা অসম্ভব বলে এক প্রতিবেদেন জানিয়েছে ব্রিটিশ দৈনিক ‘ডেইলি মেইল’।কারণ হিসেবে পত্রিকাটি বলছে, হ্যাকারা গ্রুপটি খুবই বড় এবং এর কোনো হদিসও পাওয়া যাচ্ছে না।
উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা!
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, ফিলিপাইনের ব্যাংকে সাইবার হামলা ও ২০১৪ সালে জাপানের সনি পিকচার্স হ্যাকিংয়ের সম্পর্ক থাকতে পারে বলে এক ব্লগ পোস্টে জানিয়েছে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান সিমানটেক করপোরেশন।
সনি পিকচার্স হ্যাকিংয়ের জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তদন্ত সংস্থা এফবিআই।
তদন্ত প্রতিবেদন
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে জমা দিয়েছে।
আজ বুধবার সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে সচিবালয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন অর্থমন্ত্রীকে এই প্রতিবেদন দেন।তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব গকুল চাঁদ দাস ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ।
প্রতিবেদন জমা দিয়ে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন মাত্র জমা হলো।এটি একটি বড় ধরনের ঘটনা।তাই প্রতিবেদনে কী আছে তা তা সরকার বলবে।সরকার এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে।এ কারণে সরকারকে সময় দিতে হবে।
১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।কমিটিকে এক মাসের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল।৭৫ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেবে কমিটি।
দায়ী সুইফট
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশনকে (সুইফট) দায়ী করলেন রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তিনি বলেছেন, সুইফট আরটিজিএফের সঙ্গে সংযোগ দেওয়ার ফলে এটি ঘটেছে। সুইফট নিজেই তাদের সার্ভার ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার ব্যবস্থা করেছিল। এতে এই অর্থ চুরি হয়ে গেছে।
ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ করেনি। কারণ ৩৫টি অর্ডারের মধ্যে পাঁচটি অর্ডার কার্যকর করা হয়। এ পেমেন্টে দিবে কি না, তা জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকে বার্তা প্রেরণ করে ফেডরেল ব্যাংক। অথচ ফিরতি মেসেজ না পেয়েই পেমেন্ট কার্যকর করা হয়। তাই তাদেরও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে দায়িত্বে অবহেলা, অদক্ষতা, অজ্ঞতা ও অসাবধানতাও কম দায় নয়।
সোনালী ব্যাংক চুরি
পাসওয়ার্ড চুরির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক থেকে প্রায় ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে হ্যাকাররা।শনিবার সরকারের এক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির বার্ষিক সভায় এই কথা জানিয়েছেন।
রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত এই সভায় উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এইচ এম হাবিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. আসলাম আলম, সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী প্রদীপ কুমার দত্তসহ সোনালী ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
আস্থা ফেরাতে সিইও’র লড়াই
সুইফটের মেসেজিং সিস্টেমের প্রতি সদস্য ব্যাংকগুলোর আস্থা ফেরাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক আর্থিক সমবায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী (সিইও)।তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সুইফটের মাধ্যমে ভুয়া পেমেন্ট নির্দেশনা পাঠিয়ে দুষ্কৃতকারীরা ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরির ফলে নিজেদের কৌশল পর্যালোচনা ও সঙ্কুচিত করতে বাধ্য হয়েছেন তারা।
এ খবর দিয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স।রয়টার্সকে সুইফট সিইও গটফ্রায়েড লেইব্রাডট বলেন, সুইফটের বেশ কিছু কার্যক্রম থেকে তিনি পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছেন, যাতে করে পরিকল্পনামাফিক নতুন নিরাপত্তা কার্যক্রমে অর্থ ব্যয় করা যায়।তবে বেলজিয়াম ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সুইফটের এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও দ্রুত নেয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন না।সুইফটের লন্ডন কার্যালয়ে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘কোনো কিছু সংঘটনের পরে বোধোদয় সবসময়ই দারুণ একটা জিনিস।
আপনি সবসময়ই বলবেন, তাদেরকে কি এ জিনিসটা আরও আগে করা উচিত ছিল? কিন্তু মাঝেমাঝে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে হয়।’ নিরাপত্তা খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেকদিন ধরেই মনে করা হতো যে, সুইফট সিস্টেমের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের মূল নেটওয়ার্কে প্রবেশে ব্যবহারকারীর অ্যাকসেস পয়েন্ট।কেননা, সুইফট টার্মিনালে চাবিকাঠি সংরক্ষণে সব ব্যাংকই কড়া নিরাপত্তা চর্চা করতো না।
ম্যাকিনসির সাবেক ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা লেইব্রাডট ২০০৫ সালে যোগ দেন।প্রায় চার বছর ধরে তিনি প্রতিষ্ঠানটির সিইও।তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারির আগে কোনো ব্যাংকের সুইফট টার্মিনাল হ্যাক করার প্রচেষ্টা সমপর্কে তার জানা ছিল না।বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনাটির পর, অন্য ব্যাংকগুলোও সামনে এগিয়ে এলো।তারাও একই ধরনের হামলার ভিকটিম।
সুইফটও আবিষ্কার করে, অন্য আরও ব্যাংকও হ্যাক হয়ে থাকতে পারে।এসব দুর্ঘটনার ফলে সুইফট মেসেজিং সিস্টেমের বিশ্বাসযোগ্যতা কতটুকু তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট খাতের ধারণা পালটে যায়।গত সপ্তাহে, সামগ্রিক সিস্টেম জুড়ে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করতে নেয়া পদক্ষেপের কথা প্রকাশ করে সুইফট।এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে, সন্দেহজনক পেমেন্ট ইন্সট্রাকশন শনাক্ত করতে ব্যবহৃত সুইফটের নিজস্ব সফটওয়্যারে অতিরিক্ত অথেনটিকেশন ফ্যাক্টর যোগ করা।
কিছু সমালোচক বলছেন, সুইফট ও এর মালিকানায় থাকা ব্যাংকগুলোর উচিত ছিল আরও তাড়াতাড়ি কিছু একটা করা।১৯৯২ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত সুইফটের প্রধান নির্বাহী (সিইও) থাকা লিওনার্ড স্ক্রাঙ্ক বলেন, ‘গত ১০ বছর সাইবার অপরাধবৃত্তির যে বিবর্তন ঘটেছে, তা আমলে নিয়ে সুইফট ও ব্যাংকিং কমিউনিটি কেন বেশি কিছু করেনি? এখন যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা আরও অনেক বছর আগেই নেয়া যেত।’ তবে এ ধরনের সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছেন বর্তমান সিইও লেইব্রান্ডট।তিনি বলেন, বর্তমান প্রকল্পকে সফল করার জন্য চাপে রয়েছেন তিনি।
তার আত্মবিশ্বাস, ব্যাংকে অবস্থিত সুইফট কাঠামোতে হ্যাকিং-এর ঘটনাকে বড়জোর উপদ্রব বানিয়ে দেয়া যাতে পারে, কোনো সম্ভাব্য হুমকিস্বরূপ পরিস্থিতি নয়।তিনি জানান, তার পরিকল্পনা মাফিক নেয়া পদক্ষেপে বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।অর্থাৎ, সুইফটের ব্যবহারকারী ব্যাংকগুলো অল্প ফিতে মেসেজ পাঠানোর সুবিধা আর পাবে না।
এর আরও মানে দাঁড়ায়, সুইফট নিজেরাই সঙ্কুচিত হবে।প্রধান নির্বাহী আরও বলেন, ‘আমরা কী করছি, সেদিকে একবার আমাদের তাকানো দরকার।এখন একে অগ্রাধিকার দিয়ে, আমরা পূর্বে যা করেছি তা অব্যাহত রাখতে পারবো না।এটা গ্রহণযোগ্য হবে না।’ তিনি জানান, ‘কিছু খাত’ থেকে তার প্রতিষ্ঠান পিছু হটবে।তবে এসব নির্দিষ্ট করে তিনি বলেননি।তার ভাষায়, আমি যতদূর জানি, এ সমস্যা সমাধানে কোনো কিছু সীমারেখা মানা হবে না।
কোনো কিছুই হিসাবের বাইরে রাখা হচ্ছে না।সুইফটের সাবেক অনেক নির্বাহী বলেন, এসব খারাপ কিছু হবে না।কারণ, প্রতিষ্ঠানটি ইদানীং একটু বেশি সেবাই দিয়ে আসছে।গত এক দশক ধরে, মূল সেবার বাইরের সেবাসমূহ, যেমন: পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ থেকে আয় ব্যাপকভাবে বাড়ছিল।২০১৪ সালে, মূল সেবা অর্থাৎ মেসেজিং সিস্টেম থেকে সুইফটের আয় ছিল মোট আয়ের অর্ধেকেরও কম।
যা প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে প্রথম।এসব বাড়তি সেবা কাটছাঁট করে মূল সেবার নিরাপত্তা জোরদারের দিকে আরও নজর দিতে চায় সুইফট।
এমআর





