এখন দেশে ভোট এ রকমই হয়। এর চেয়ে ভালো নির্বাচন হওয়ার সুযোগ নেই। আমার করার কিছু নেই। আপনারা দেখছেন সারা দেশে এভাবেই নির্বাচন হচ্ছে। এখানে আমাদের করার কী আছে? কথাগুলো বলেছিলেন নড়াইলের লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের দক্ষিণ চরম্বা এন. ইসলাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার আক্কাস আলী। তিনি কৃষি ব্যাংক লোহাগাড়া শাখার ব্যবস্থাপক।

সকাল দশটা ৪৫ মিনিটের দিকে কেন্দ্রটিতে দেখা যায় ভোট গ্রহণ শেষ। একেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ছিল ১৭২৩। নৌকার প্রার্থী সমর্থকরা কেন্দ্রটি দখল করে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে করে দিয়েছেন। কেন্দ্রটির কয়েকটি বুথে গিয়ে দেখা যায় ৬-৭ জন যুবক প্রকাশ্যে সিল মারছে। কোথাও কোনো বাধা নেই। কেন্দ্রটির প্রতিটি রুমে হইচই। মনে হচ্ছিল কোনো মাছের বাজার।

একাধিক মেম্বার প্রার্থী অভিযোগ করেছেন, পুলিশের সহায়তা নৌকার প্রার্থীর সমর্থকেরা ফিল্মি স্টাইলে ভোট দিয়েছে। একাজে সহযোগিতা করেছেন কেন্দ্রটি দায়িত্বরত পুলিশ অফিসার লোহাগাড়া থানার এএসআই মনির। ওসমান নামে এক ভোটার অভিযোগ করেন, মারধর করে তাকে কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছেন।

এদিকে বেলা ১১টার দিকে চরম্বার মাইজবিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হঠাৎ নৌকার সমর্থকেরা হামলা করে ব্যাল্টবাক্স নিয়ে যাবার চেষ্টা করে। এ সময় চশমা প্রতীকের সমর্থকেরা গাছ ফেলে রাস্তা অবরোধ করে। এ সময় কেন্দ্রটি পুরো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ প্রতিবেদকসহ কয়েকজন সাংবাদিক সেখানে আটকা পড়েন। ভোটাররা প্রাণভয়ে কেন্দ্র থেকে পালিয়ে যান। এ সময় ভোটারের ইটের আঘাতে দায়িত্বপালনরত তরিকুল ইসলাম (২৪) নামে এক পুলিশ কনেস্টবেল গুরুতর আহত হন। রাস্তায় গাছের গুড়ি ফেলে ব্যারিকেডের কারণে পুলিশ সদস্যকে চিকিৎসা করাতে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছিল না। কেন্দ্রটি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ১০/১২ রাউন্ড ফাঁকাগুলি ছোড়ে।

কেন্দ্র থেকে সহিংসতায় জড়িত ধাকার অভিযোগে আব্বাস (২৪) ও আলমগীর নামে দুইজনকে আটক করা হয়েছে। কেন্দ্রটির একটি রুমে কেন্দ্রটির প্রিসাইডিং অফিসার ফরিদুল আলম আটকা পড়েন। কেন্দ্রের প্রতিটি বুথে শত শত ব্যালট পেপার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। সন্ত্রাসীদের ভয়ে কেউ ব্যালট পেপারগুলো নিতে পারছিলেন না। বিভিন্ন প্রার্থীর এজেন্টরা সন্ত্রাসীদের ভয়ে আগেই কেন্দ্র থেকে পালিয়ে যান। এক পাশে নৌকা প্রতীকের সমর্থকেরা অন্যদিকে শফিকুল ইসলাম এর চশমা প্রতীকের সমর্থকেরা অবস্থান নেন। কিছু ভোটার সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে রাস্তায় বিক্ষোভ করে ও ব্যারিকেড দিয়ে সড়ক বন্ধ করে দেন।

স্থানীয় ভোটার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক জানান, হঠাৎ করে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে ভোটারদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেন। এরপর সন্ত্রাসীরা ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভরিয়ে দেন। এসময় উত্তেজনা জড়িয়ে পড়ে।

প্রিজাইডিং অফিসার ফরিদুল আলম জানান, ভাই আমাদের করার কিছু নেই। সন্ত্রাসীরা কেন্দ্র হামলা করেছে। এ কারণে ভোট গ্রহণ বন্ধ করা হয়েছে। এখানে পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ। ভোট গ্রহণের পরিবেশ নেই। আমাদের জানের ভয় রয়েছে।

এসময় উত্তেজিত জনতা জানান, সন্ত্রাসীরা ভোটের বাক্স নিয়ে গেছে। নৌকার প্রার্থীরা জোর করে কেন্দ্রে ঢুকে ব্যালটে সিল মেরেছে। ভোটারদের পিটিয়ে বের করে দিয়েছে। এলাকার শ্রদ্ধাভাজন পীর মাওলানা গোলাম রসুল কমরী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনিও অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন সাংবাদিকদের কাছে।

স্বতন্ত্র প্রার্থী চরম্বা ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান ও মোটরসাইকেল প্রতীকের প্রার্থী অধ্যাপক সাদাত উল্লাহ বলেন, জনগণ ভোট কিভাবে দিবে। ভোটের চেয়ে জানের মূল্য অনেক। সন্ত্রাসীদের ভয়ে সাধারণ ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে পারছেন না।

এ ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করছেন শফিকুর রহমান ওরফে মাস্টার শফি, ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছেন শাহ আলম। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন- সাদাত উল্লাহ (মোটরসাইকেল), শামশুল আলম (আনারস), শফিকুল ইসলাম (চশমা)।

একইভাবে চুনতি ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থীর সমর্থকেরা ফিল্মি স্টাইলে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোট কেন্দ্র দখল করে ভোট দিয়েছেন। এ ইউনিয়নে সকাল থেকেই কারচুপি শুরু হয়। ভোটারদের অভিযোগ- চেয়ারম্যান পদের কোনো ব্যালট দেয়া হয়নি তাদেরকে। মেম্বার পদের ব্যালট দিয়ে বলা হয় চেয়ারম্যান পদে ভোট দিতে হবে না।

এ ইউনিয়নের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী নূর মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ নির্বাচন বর্জন করেছেন। তিনি রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিত পত্র দিয়ে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।

তিনি বলেছেন, সবক'টি কেন্দ্রে নৌকার সমর্থকরা দখলে নিয়ে ভোট কেড়ে নিয়েছে। এখানে সাধারণ জনগণ চরম অসহায়।

পুটিবিলা ইউনিয়নের গড়স্থান এলাকার আখতারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসা এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী ফরিদুল আলমের গাড়িতে হামলা করে নৌকার সমর্থকেরা। এর প্রতিবাদে ও নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট ডাকাতির অভিযোগ এনে বর্তমান চেয়ারম্যান ফরিদুল আলম নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। একই সাথে এ ইউনিয়নের ধানের শীষের প্রার্থী মুন্সি ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীও নির্বাজন বর্জনের ঘোষণা দেন।

তবে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে, লোহাগাড়া উপজেলার ১ নং বড়হাতিয়া ইউনিয়নে। এ ইউনিয়নের চাকফিরানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মনুফকির হাট এলাকার বোর্ড অফিস কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ভোট দেয়ার জন্য ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। ইউনিয়নটির প্রতিটি ভোট কেন্দ্র ভোট গ্রহণ মোটামুটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভোটাররা।

এদিকে কলাউজান ইউনিয়নের সকাল থেকে মোটামুটি সুষ্ঠু ভোট গ্রহণ হলেও বিকাল তিনটার দিকে ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী আদার চর কেন্দ্রে হামলা চালায়। এ সময় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এ সুযোগে তারা বুথে প্রবেশ করে নৌকা প্রতীকে সিল মারতে থাকে। প্রতিবাদে রাস্তায় গাছ ফেলে এলাকাবাসী অবরোধ করে।

এমআইএস