বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমুদ্র সীমা নিষ্পত্তির রায় আজ প্রকাশ করা হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ রায় প্রকাশ করা হবে।
সোমবার বাংলাদেশ সময় দুপুর দুইটায় নেদারল্যান্ড-এর হেগে অবস্থিত সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক স্থায়ী সালিশ আদালত (পিসিএ) এ রায় প্রদান করে এবং মামলাটির দুই পক্ষ বাংলাদেশ ও ভারতের প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর করে।
এই রায়ের ফলে দীর্ঘদিনের বিরোধের শান্তিপূর্ণ ও আইনি সমাধান হয়েছে, নিশ্চিত হয়েছে দুই দেশের নতুন সমুদ্রসীমা। রায়টি বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের পর ভারতের সঙ্গেও নিশ্চিত হলো ন্যায্য অধিকার, জয় হলো বন্ধুত্বের।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শেখ বেলাল আহমেদ রায় গ্রহণ করেন ও ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠান।
স্থায়ী সালিশ আদালতের বিধান অনুযায়ী রায় হস্তান্তরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা প্রকাশ করা যাবে না। তাই আজ মঙ্গলবার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে রায় প্রকাশ করবে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বহিঃপ্রচার অণুবিভাগের মহাপরিচালক সালাউদ্দিন নোমান চৌধুরী সোমবার দুপুরে সাংবাদিকদের জানান, ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের রায় সরকারের কাছে এসেছে। এখন রায়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার বিকালে রায়ের ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।
২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে হেগে স্থায়ী সালিশ আদালতে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ মামলায় বাংলাদেশ ও ভারত নিজ নিজ পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। উভয়পক্ষের শুনানিশেষে ছয় মাসের মধ্যে রায় প্রদানের কথা জানান সালিশ আদালত।
২০০৯ সালের ৮ অক্টোবর স্থায়ী সালিশ আদালতে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মামলা করে বাংলাদেশ।
সমুদ্রসীমা নির্ধারণে সমদূরত্বের রেখা টানার যুক্তি দেয় ভারত। এর ফলে সমুদ্রতট থেকে সীমারেখা হবে ১৬২ ডিগ্রি। অন্যদিকে বাংলাদেশ উপকূলীয় রেখা অবতলীয় হওয়ায় ন্যায্যতার (ইক্যুইটি) ভিত্তিতে সীমারেখা টানার কথা বলে। যেখানে রেখা হবে ভূমির মূল বিন্দু থেকে সমুদ্রের দিকে ১৮০ ডিগ্রি।
মামলায় বাংলাদেশের এজেন্ট ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমুদ্রবিষয়ক ইউনিটের সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম বাংলাদেশের পক্ষে মামলায় ডেপুটি এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশের পক্ষে কৌঁসুলি হিসেবে ছিলেন লন্ডনের ম্যাট্রিক্স চেম্বার্সের প্রফেসর জেমস ক্রোফোর্ড এসসি, প্রফেসর ফিলিপ স্যান্ডস কিউসি, এসেক্স কোর্ট চেম্বার্সের প্রফেসর অ্যালান বয়েল, মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর পায়াম আকাভান, ওয়াশিংটন ডিসির ফলি হগ এলএলপির পল এস রিখলার ও লরেন্স মার্টিন।
অন্যদিকে মামলায় ভারতের পক্ষে এজেন্ট ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও আইনি উপদেষ্টা ড. নিরু চাধা এবং কো-এজেন্ট ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা।
ভারতের কৌঁসুলিদলে ছিলেন আর কে পি শংকরদাশ, প্যারিস ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি নানতেরে-লা ডিফেন্সের প্রফেসর অ্যালিয়ান প্যালেট, লন্ডনের স্যার মাইকেল উড, ইয়েল ল স্কুলের প্রফেসর ডাব্লিউ মিশেল রেইসম্যান।
আশির দশকে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ নিয়ে বিরোধ হয়েছিল বাংলাদেশ ও ভারতের। উভয় দেশ এই দ্বীপকে নিজের বলে দাবি করেছিল।
ওই এলাকার বাংলাদেশ-ভারতের সীমানা বিভাজক হাড়িয়াভাংগা নদীর মূলস্রোত যেহেতু দ্বীপের পশ্চিম ভাগ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল, সেহেতু ‘নদীর মূল স্রোতধারার মধ্যরেখা নীতি’ অনুযায়ী বাংলাদেশ ওই দ্বীপটিকে নিজ দেশের অন্তর্ভুক্ত করছিল। কিন্তু ভারতের দাবি ছিল,নদীর মূলস্রোত পরিবর্তনশীল।
বাংলাদেশ দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা দাবি করলেও ভারত ১৯৮১ সালে সেখানে সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে তাদের পতাকা ওড়ায়।
তবে বর্তমানে ওই দ্বীপটির অস্তিত্ব নেই। জানা গেছে, মামলার বিচারকরা বাংলাদেশ ও ভারত থেকে আলাদাভাবে ওই স্থান পরিদর্শন করেছেন। দ্বীপের অস্তিত্ব না থাকায় এখন আর তা আদালতের রায়ে পাওয়া না পাওয়ার বিষয় নেই। তবে দ্বীপটির অস্তিত্ব থাকলে তা দুই দেশের সীমা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।
ঢাকা, ৮ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম)// এসআর