রাজধানীর পূরাণ ঢাকার ডন হিসেবে খ্যাত সাইদুর রহমান শহীদ। রাজধানীর ৮৩ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার এই সাইদুর রহমান। তবে ভয়ঙ্কর চাঁদাবাজি আর ঠান্ডা মাথায় মানুষ হত্যা করায় রাজধানী জুড়ে দ্রুত পরিচিত পান শহীদ কমিশনার। পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া ও শ্যামপুর এলাকার অপরাধ জগতের সম্রাটও বলা হয় তাঁকে। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অবৈধ অস্ত্র সাথে রাখা ও তা ব্যবহারের অভিযোগে মঙ্গলবার (আজ) ভোরে শহিদ কমিশনারের গেন্ডারিয়ার সতীশ সরকার লেনের বাসায় অভিযান চালায় র্যা ব-১০। সেখান থেকে তিনটি বিদেশি পিস্তল,তিনটি ম্যাগাজিন ও ৬২টি গুলিসহ তাঁকে গ্রেফতার করে র্যা ব সদস্যরা। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে গেন্ডারিয়া থানায় অস্ত্র আইনে একটি মামলা দায়ের করেছে র্যা ব-১০।
তবে এই শহীদ কমিশনার এক সময় ছিলেন গোডাউনের কুলি। এখন তিনি হাজার কোটি টাকার মালিক। রাজধানীতে রয়েছে তাঁর কয়েক শ কাটা জমি। নির্বাচন অংশ নিয়ে অস্ত্রের জোরে ওয়ার্ড কমিশনারও নির্বাচিত হন তিনি। এমনিক সর্বশেষ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনও করেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়,শহীদের কর্মজীবন শুরু গোডাইন কুলি সর্দার হিসেবে। কখনো শ্রমিক। আবার কখনো স্থানীয় বাজারের খুচরো মাছ বিক্রেতা। পৈত্রিক সম্পতি ছিলো না মোটেও। অর্থাভাবে হয়নি প্রাইমারি স্কুলেরও গন্ডি পেরোনো।
অথচ তিনিই আজ হাজার কোটি টাকার মালিক। শুধু ঢাকাতেই রয়েছে ডজন খানেক আলীশান বাড়ি। সন্তানদের লেখাপড়া করাচ্ছেন সুদুর আমেরিকায়। সেখানেও রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট,নাইট ক্লাবসহ একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
এ সবই করেছেন পেশী শক্তি আর অবৈধ অস্ত্রের জোরে। আর এসব সম্পদ করতে গিয়ে চাঁদাবাজি,জবরদখল,খুন,গুম থেকে শুরু করে এহেন কোন অপকর্ম নেই যা তিনি করেন নি। এসব অপরাধে ফাঁসির আদেশ হয়েছিলো তার।
এলাকাবাসী জানায়,সাইদুর রহমান কর্মজীবন শুরু করেন মিল ব্যারাক সিএসবি গোডাউনে কুলির কাজের মধ্যে দিয়ে। এরপরে গেন্ডারিয়া বাজারে খুচরা মাছের দোকানদারি করেন তিনি। কিছুকাল তিনি ভাড়াটে শ্রমিকও কাজ করেন। এরপর আস্তে-ধীরে তিনি এলাকায় গড়ে তোলেন সন্ত্রাস বাহিনী। শুরু করেন অস্ত্রের ঝনঝনানি, চাঁদাবাজি। তাঁর ইশারায় চলে পুরান ঢাকার সূত্রাপুর,গেন্ডারিয়া ও শ্যামপুর এলাকা।
অস্ত্রের জোরে গেণ্ডারিয়ায় কবরস্থানের জায়গা দখল করে প্লট বানিয়ে নাম দিয়েছেন শহীদনগর। অভিযোগ রয়েছে,গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশনের বিপরীতে অন্যের জমি আগ্নেয়াস্ত্রের ভয় দেখিয়ে দখল করেন শহীদ কমিশনার। সেখানে প্লট বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন মার্কেটও।
ডিআইটি প্লট বাসিন্দারা জানান,এখানকার সৌন্দর্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা পুকুরটি তিনি দখল করেছেন। এরপর তিনি সেখানেমাটি ভরাট করে নিজের নামে সাইনবোর্ড টানিয়েছেন।
তাঁর কথা কেউ না শুনলে সোজা ওপারের টিকেট ধরিয়ে চিরদিনের জন্য বিদায় দিতেন। সেই সাইদুর রহমান ওরফে শহীদ কমিশনার পুরান ঢাকার বিশেষ করে সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া ও শ্যামপুর এলাকার অপরাধ জগতের সম্রাট বনে যান। তার বিদেশে অবস্থান মানেই পুরান ঢাকার কোথাও না কোথাও লাশ পড়েছে বলে মনে করে এলাকাবাসী।
ঢালকা নগরের সেলিম,ভাট্টিখানার মাহবুব,সূত্রাপুরের নাসির,মিল ব্যারাকের বুংগা বাবু,ফরিদাবাদের আনু,পিন্টু,পিন্টুর ভাই সেন্টু,পোস্তগোলার শাহাদাৎ কমিশনার ও তার সুমন,মিল ব্যারাকের মাইকেল,ফরিদাবাদ আলমগঞ্জের বাদল এবং কেবি রোডের সেলিম হত্যা মামলার আসামি হিসেবে বহুল আলোচিত তিনি।
এসব করতে গিয়ে অনেক মামলায় জড়িয়েছেন। হত্যা মামলার বেশ কয়েকটিতে জেল খেটেছেন শহীদ। বহুল আলোচিত এ্যাডভোকেট হাবিব মন্ডল হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকায় নিম্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে ফাঁসির দন্ডাদেশও হয়েছিলো। কিন্তু প্রভাব আর আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে উচ্চ আদালত থেকে তিনি ফাঁসির দন্ডাদেশ থেকে ঠিকই মুক্তি পান। অনেক ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হলেও ভয়ে কেউ সাক্ষ্য দিতে পারেননি।
ফাঁসির দন্ডাদেশ নিয়ে দীর্ঘ ১০ বছর জেল খাটার পর সম্প্রতি তিনি মুক্তি পান। এরপর চলে যান আত্মগোপনে। সেন্টু ও শাহাদাত হত্যা মামলায় রায় না হলেও উচ্চ আদালতে এ দুটি মামলার কার্যক্রম থেমে আছে।
জানা যায়,আত্মগোপন থেকে হঠাৎই নির্বাচনী প্রচারনার দোহাইয়ে সন্ত্রাসীদের নিয়ে এলাকায় মহড়া দিয়ে প্রকাশ্যে আসেন শহীদ। দশম জাতীয় সংসদ নির্বচনে অংশগ্রহণ করতে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রাথী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করে হেরে যান।
এলাকাবাসীর অভিযোগ,নির্বাচনী প্রচারনার অন্তরালে এলাকায় আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালায় শহীদ। এ জন্য তিনি সম্প্রতি সন্ত্রাসী গুন্ডাবাহিনী নিয়ে এলাকায় সকাল বিকেল মহড়া দেয়া শুরু করেন।
দাগী ও চিহিৃত সন্ত্রাসীদের নিয়ে শহীদ কমিশনারের এ মহড়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে গেছে অতীতে। কিভাবে তিনি হত্যা,সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও সহজ সরল ব্যক্তিদের ভূমিহীন করেছেন। সেই সব স্মৃতি মন্থন করে অনেকেই ছিলেন শঙ্কিত। তবে এবার র্যা বের কাছে অস্ত্রসহ হাতে নাতে গ্রেফতার হওয়ায় এলাকাবাসী মনে করছেন এবার আর রক্ষা নেই শহীদ কমিশনারের।
[b]ঢাকা, জে ইউ, ৪ জানুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেএইচ[/b]