শহর-বন্দরের গলি, ফুটপাতে থাকা তার মতো হাজার হাজার ‘রানা’র জীবনকথা, চাওয়া, না-পাওয়া, বঞ্চনার চিত্র ফুটে উঠেছে ‘গালি বয়’ ভিডিওতে। ওই র্যাপ-ভিডিওর হাত ধরেই রসুলপুরের ৮ নম্বর গলির স্বর পৌঁছে গেছে বিশ্ববাসীর কাছে। গালি বয়। মূল নাম রানা মৃধা। থাকে ঢাকা শহরের কামরাঙ্গীরচরের পূর্ব রসুলপুর এলাকার আট নম্বর গলিতে।
সম্প্রতি তার গাওয়া র্যাপ-ভিডিও চমকে দিয়েছে দু’বাংলার মানুষকেই। ফলে ভারতের পত্র-পত্রিকাও রানাকে নিয়ে খবর ছাপছে।
‘গালি বয়’ ১০ বছর বয়সী রানার পরিচিতি এখন একজন র্যাপ গায়ক হিসেবে। কেবল দেশেই নয়, দেশের সীমানা পেরিয়ে রানা এখন দারুণ জনপ্রিয় ওপার বাংলাতেও। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারের শিরোনাম ছিল ‘বাস্তবের ‘গালি বয়’কে চেনেন? ঢাকার বস্তি থেকে উঠে এখন বাংলা র্যাপের ধামাকা।’
‘গালি বয়’ ভাইরাল হতেই রানা এখন পাচ্ছে তারকার মান। ফোনে আনন্দবাজারকে রানা বলেছে, ‘আগে লোকের কাছে টাকা চাইলে কইত, কাজ কইর্যা খাইতে পারস না? ইস্কুলে যাও না?’ আর এখন? সেই লোকজনই রানাকে ডাকে, ‘গালি বয়!’ রাস্তাঘাটে তার সঙ্গে সেলফি তোলার আবদারও আসছে। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ফুল বিক্রি করার কাজটাও আপাতত আর করতে হচ্ছে না।
ঢাকা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা। তার পাড় ঘেঁষে থাকা কামরাঙ্গীরচরের পূর্ব রসুলপুর এলাকায় মূলত দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের বাস। সেখানকার বাবা-মায়েরা সকাল হলেই চলে যান লোকের বাড়ি কাজ করতে বা দিন মজুরি খাটতে। তাদের ছেলেমেয়েরা তাই দিনের অধিকাংশ সময়ই ঘুরে বেড়ায় শহরের এ গলি থেকে ও গলি। ধূপকাঠি বা মালা বিক্রি করতেও বেরিয়ে পড়ে কেউ কেউ। ক্লাসরুমের অভিজ্ঞতা ওদের অনেকের জীবনেই আসে না। যাদের আসে, তাদেরও সে সুযোগ বেশি দিন টেকে না।
‘গালিবয়’খোঁজ
এ রকম পরিবেশেই বড় হচ্ছে রানা। একা নয়, রানার মতো হাজার হাজার ‘গালিবয়’। রানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ফুল বিক্রি করত। ছোট্ট রানার বাবা থেকেও নেই। ভাইবোনদের নিয়ে মায়ের সঙ্গে থাকে সে। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সামনে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরবি সাহিত্যের ছাত্র মাহমুদ হাসান তবীব।
ফুল বিক্রি করতে করতে রানা তার কাছে ছুটে গিয়ে বাইক চড়ার আবদার করে। তবীবও ফেরাননি। রানাকে বসিয়ে নিয়েছিলেন বাইকে। তারপর যেতে যেতে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তুই গান গাইতে পারিস?’ বাইকে বসেই রানা সে দিন তবীবকে শুনিয়েছিল একটা গানের কয়েকটা লাইন।
তবীব ছোট থেকেই হিপহপের ভক্ত। বাংলায় র্যাপ বানানোর স্বপ্ন দেখতেন। গান বানানোর কথা ভাবতেন। কিন্তু বিষয় কী হবে? তবীব বলেন, ‘কিছু দিন আগে রণবীর সিংহ অভিনীত বলিউড ছবি গালি বয় দেখেছিলাম। ওই সিনেমা দেখেই ঠিক করে ফেলি, ঢাকাইয়া গালিবয়দের জীবনকেই র্যাপের বিষয় বানাব। আর সে রকম একটা সময়েই রানার সঙ্গে পরিচয়।’
রানাকে পেয়ে গালিবয়দের জীবন আরও কাছ দেখার সুযোগ পেলেন তবীব। তার পর তবীবের লেখা ও পরিচালনায় রানাকে নিয়ে তৈরি হল ‘গালি বয়’। এই ভিডিওর দুটি পর্ব ইতিমধ্যেই ভাইরাল সোশ্যাল মিডিয়ায়। তৃতীয় পর্বও আসতে চলেছে ঈদের পরেই। প্রথম ভিডিওতে রানার সঙ্গে পরিচয়ের পাশাপাশি গালি বয়দের জীবনচিত্র তুলে ধরেছিলেন তবীব। দ্বিতীয় ভিডিওতে রানাদের সমস্যা নিয়ে একরাশ প্রশ্ন সমাজের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। শিশুদের শিক্ষা ও পুষ্টির মতো মৌলিক অধিকারের বিষয় নিয়ে সমাজের উদাসীনতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে তবীব-রানার ‘গালি বয়’।
রানার যদিও এসবে কোনও হেলদোল নেই। প্রাণের আনন্দেই সে দিন কাটাচ্ছে। যেমনটা আগেও কাটাত। তবে ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর চার পাশের ব্যবহারটাই তার সঙ্গে পাল্টে গেছে।
কিন্তু বাকি ‘রানা’দের কী হবে? গানে সে প্রশ্নটাও সযত্নে করে রেখেছে সে...‘এই গান গেয়ে আমি আজ ভাইরাল, বাকি রানাদের বলো কী হবে কাল?’ নিজের অজানতেই বলেচলে এই গালি বয় রানা তবে এটাই সত্য বাকি রানাদের কোন খোজঁ আছে কি এ সমাজে? রানা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে তার ক্ষুধার যন্ত্রনার কথা । তার হয় তোবা ভাগ্যর গুনে পরিচয় মিলেছে! কিন্তু বাকিদের ? তারা হয় তো বা ক্ষুধার যন্ত্রনা বলতে পারে না, পারে না দেখাতে কাউকে?
এএস





