তরলায়িত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বন্দর নির্মাণকাজ শেষ হবে আগামী বছরের ডিসেম্বর নাগাদ। তখন থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হবে এবং শিল্পে নতুন গ্যাস সংযোগ দেবে সরকার। এই সময়সীমার কথা মাথায় রেখে ব্যবসায়ীদের নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা করার পরামর্শ দিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাণিজ্য সহায়ক পরামর্শক কমিটির বৈঠকে ব্যবসায়ীরা জানতে চান, কবে নাগাদ শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে। তাঁদের এ প্রশ্নের জবাব দিতে অর্থমন্ত্রী নির্দেশ দেন ভারপ্রাপ্ত জ্বালানিসচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরীকে। ‘২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এলএনজি টার্মিনাল ও বন্দর নির্মাণ সম্পন্ন হবে। এরই মধ্যে ৭০ শতাংশ ট্রান্সমিশন লাইন স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। তখন থেকেই শিল্পে নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে’—বলেন জ্বালানিসচিব।
ছয় বছর ধরে জ্বালানি বিভাগ টার্মিনাল ও বন্দর নির্মাণ করতে না পারায় ক্ষুব্ধ হন মুহিত। পরে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা যখন ব্যবসা-বিনিয়োগের পরিকল্পনা করবেন, তখন ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে গ্যাস সংযোগ পাওয়া যাবে—কথাটি মাথায় রাখবেন। আগে থেকে মূলধনী যন্ত্রপাতি নিয়ে বসে থাকবেন, এটা ঠিক নয়।’
মাস ছয়েক আগে গ্যাসের দাম দ্বিগুণ করার পর আবারও দাম বাড়ানোর সরকারি উদ্যোগের কঠোর সমালোচনা করেন ব্যবসায়ীরা। তখন জ্বালানিসচিব তাঁদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘গ্যাসের দাম বাড়ানোর একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রান্না ও গাড়িতে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে। এ দুই খাতে মোট গ্যাসের ২০ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। সরকার এখান থেকে বছরে প্রায় এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা পায়। অথচ এই পরিমাণ গ্যাস বিদ্যুৎ খাতে দেওয়া হলে সেখান থেকে পাওয়া যাবে ৮০ হাজার কোটি টাকা।
জ্বালানিসচিব বলেন, ‘সার কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়বে না। তবে যেহেতু এনার্জি রেগুলেটরি অথরিটি একটি স্বাধীন সংস্থা, তাই আগাম কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে চেষ্টা করব, যাতে গ্যাসের দাম ব্যবসায়ীদের জন্য সহনীয় পর্যায়ে থাকে।’
আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া ভ্যাট আইনে এফবিসিসিআই ও এনবিআরের যৌথ পরামর্শক কমিটির সুপারিশ করা সাতটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যবসায়ীরা অনুরোধ করেন। পৃথক বৈঠকে এ আইন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা পণ্য উত্পাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে মূল্য সংযোজনের সঠিক হিসাব রাখলে ১৫ শতাংশ ভ্যাট তাঁদের কাছে খুবই সহনীয় বলে মনে হবে। তবে নতুন আইন বাস্তবায়ন যাতে সহজ হয়, সে জন্যই সবার জন্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। তিন-চার বছর পর বিভিন্ন খাতে এটি কমবেশি হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইন কার্যকর করা হলেও আমদানি পণ্যের ওপর থেকে সম্পূরক শুল্ক পুরোপুরি উঠে যাবে, তা নয়। দেশীয় শিল্পের স্বার্থ অবশ্যই সুরক্ষা করা হবে। করপোরেট কর হার ৪৫ শতাংশ থেকে কিছুটা কমানো যেতে পারে।
ব্যাংকঋণের সুদের হার কমার তথ্য উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকঋণের সুদের হার কমায় সঞ্চয়পত্রের সুদের হারও কমানো হবে।
বিদেশি পণ্যের হাত থেকে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় গুরুত্ব দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিশ্বে অনেক পণ্যের দাম কমে গেছে। আমদানিকারকরা তা দেশে আনছে। এতে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভারত আমাদের সব পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও ১২.৫ শতাংশ হারে কাউন্টারভেইলিং শুল্ক আরোপ করে নিজেদের শিল্পের স্বার্থ রক্ষা করছে।’
ভ্যাট আইন সম্পর্কে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এমন কিছু যাতে আমরা না করি, যা ব্যবসায়ীদের ক্ষতিগ্রস্ত করে। করপোরেট কর হারও সহনীয় পর্যায়ে নামাতে হবে।’
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান ব্যবসায়ীদের কাছে তিনটি অনুরোধ করে বলেন, ‘বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে আপনাদের সহায়তা চাই। এতে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের গোয়েন্দারা এটি নিয়ে কাজ করছেন। বন্ড সুবিধা অপব্যবহারের ভয়াবহ তথ্য পাচ্ছি।’
ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্দেশে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আপনাদের সমিতির সদস্যরা যাতে নিয়মিত রাজস্ব পরিশোধ করেন, সে জন্য আপনারা উদ্যোগী হবেন। এবার উপজেলা পর্যায়ে আয়কর বিস্তৃত করা হচ্ছে। শিগগিরই নবনির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বসে ইউনিয়ন পর্যায়েও কর আদায়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর শিল্প মালিকদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে যাতে সরকার ঠিকমতো কর আদায় করতে পারে, সে জন্য ব্যবসায়ীদের সহায়তা চান তিনি। নজিবুর রহমান বলেন, অনেক বিদেশি কর দিচ্ছেন না, যাঁরা দিচ্ছেন, তাঁরাও বেতন কম দেখিয়ে দিচ্ছেন। আবার পর্যটক ভিসায় এসে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে যাচ্ছেন বিদেশিরা।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি সালমান এফ রহমান বলেন, ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের আগে অন্তত যৌথ পরামর্শক কমিটির সাতটি সুপারিশ এতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সম্পূরক শুল্ক তুলে দেওয়া হলে কাউন্টারভেইলিং বা এন্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে দেশীয় শিল্প রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে। করপোরেট কর হার কমানোরও প্রস্তাব দেন তিনি।
এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ কার্যকর করার আগে ভ্যাট আইন সংশোধন করার প্রস্তাব দিয়ে বলেন, না হলে জটিলতা দেখা দেবে। এতে সরকারের ভ্যাট আদায়েও সমস্যা হবে।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, বিদ্যুৎ উত্পাদন সক্ষমতা বাড়লেও গ্রিডে বিদ্যুৎ থাকছে না। সরকার যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করছে, সেখানে কবে নাগাদ বিনিয়োগ করা যাবে, তার কোনো ঘোষণা নেই। সুনির্দিষ্ট ধারণা ব্যবসায়ীদের দেওয়া না হলে তাঁরা বিনিয়োগ পরিকল্পনা করবেন কিভাবে?
ডিজেলের দাম লিটারে তিন টাকা কমানোর সমালোচনা করে এ কে আজাদ বলেন, শিল্প-কারখানার জন্য আমদানি মূল্যে ডিজেল সরবরাহ করতে হবে। না হলে বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হবে না। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সরকার যখন নিরবচ্ছিন্নভাবে মানসম্পন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে, তখন আমরা মূল্যবৃদ্ধি মেনে নেব।’
তৃতীয় কোনো দেশে বিনিয়োগ না থাকলে বাংলাদেশ থেকে ক্রেতারা পোশাক আমদানি করতে অনীহা প্রকাশ করছে উল্লেখ করে এ কে আজাদ বলেন, ‘আমাদের বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে। আমরা ভারত থেকে তুলা এনে সুতা তৈরি করি। কিন্তু ভারতীয় তুলার মান ভালো নয়। স্পিনাররা আমেরিকা বা আফ্রিকায় বিনিয়োগ করে সেখান থেকে সুতা উত্পাদন করে দেশে আনতে পারে।’
বিকেএমইএর সভাপতি এ কে এম সেলিম ওসমান বলেন, তেলের মূল্য কিছুটা কমানোয় নিটশিল্প সুবিধা ভোগ করছে। তবে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ সুবিধা চালুর প্রস্তাব করেন তিনি।
বিজিএমইএর সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘২০১৪ সাল পর্যন্ত পোশাক রপ্তানিকারকদের ওপর ১০ শতাংশ হারে করপোরেট কর ছিল। পরে তা ৩৫ শতাংশ করা হয়েছে। বিভিন্ন বৈঠকে অর্থমন্ত্রী ২০১৫ সাল থেকে এই কর ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে চেয়েছেন। কিন্তু আমরা চাই ২০১৪ সাল থেকেই এটি কার্যকর করা হোক।’ তিনি বলেন, রপ্তানিকারকদের জন্য কোনো ক্ষেত্রেই ভ্যাট থাকা উচিত নয়।
বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সেলিমা আহমেদ বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলেও প্রশ্ন করা হয়, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ আছে কি না। এ সমস্যার সমাধান চেয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের ফ্যাশন হাউসগুলো সারা বছর ধরে রোজার মাসের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর এই সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে চোরাই পথে পোশাক এসে দেশের বাজার ভরে যায়।’ চোরাই পথে পোশাক আসা বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে পরামর্শ দেন তিনি।
রিহ্যাবের প্রথম সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, আবাসন খাত দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছে। এ খাতের ওপর নির্ভরশীল আরো ২৬৯টি উপখাত। আগে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ যাতে ফ্ল্যাট কিনতে পারে, সে জন্য ঋণের ব্যবস্থা ছিল। সেটি আবারও চালু করতে হবে। রিহ্যাব বাজেটের জন্য যেসব প্রস্তাব দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা জরুরি। আর দেশে মাত্র ১৪ লাখ মানুষ আয়কর দিচ্ছে। বাকিদের অর্থ যেন দেশেই বিনিয়োগ হয়, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, অর্থবিভাগের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ, ব্যবসায়ী নেতা ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন, তপন চৌধুরী, মোস্তফা কামাল, ফজলুর রহমান, মাহবুবুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এইচ ই





