কুষ্টিয়া পৌরসভায় ২০০৪ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনে মেয়র পদে বিজয়ী হন জেলা আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ার আলী।

মামলা-সংক্রান্ত জটিলতায় এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি প্রথম শ্রেণীর এ পৌরসভায়। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে মেয়র পদে বহাল আছেন আনোয়ার আলী। সাম্প্রতিক সময়ে মামলাজনিত জটিলতা কেটে যাওয়ায় আসন্ন পৌর নির্বাচনে এ পৌরসভাতেও নির্বাচন হবে।

দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচন নিয়ে এরই মধ্যে বিপুল আগ্রহ-উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। অবশ্য কয়েক বছর ধরেই স্থানীয় বিভিন্ন দলের একাধিক নেতা প্রার্থিতার আভাস দিয়ে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের সিদ্ধান্তে তাদের প্রচারে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। দলীয় সমর্থন নিশ্চিতের জন্য জোরালো লবিংও শুরু করেছেন সম্ভাব্য অনেক প্রার্থী।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালের পর কুষ্টিয়ায় নির্বাচন হয়নি। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী ডিসেম্বরে এ পৌরসভায় নির্বাচন হবে। এবার এ পৌরসভার সীমানা ও ভোটার বৃদ্ধি পেয়েছে। ১২টি থেকে এ পৌরসভার বর্তমান ওয়ার্ড সংখ্যা ২১টি। স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র জানায়, বর্তমান মেয়র আনোয়ার আলী ক্ষমতাসীন দলের জেলা কমিটির একাংশের সভাপতি।

গত ১১ বছর ধরে দক্ষতার সঙ্গে মেয়রের দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। ২০০৪ সালের আগেও তিনি একাধিকবার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। শহরের উন্নয়নে প্রচুর কাজ করায় ভোটারদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। দলের বাইরে স্থানীয় নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশের সমর্থনও রয়েছে তার পক্ষে। আগামী নির্বাচনে প্রার্থিতার ব্যাপারে আনোয়ার আলী বলেন, দীর্ঘদিন পৌরবাসীর সেবা করেছি। কী কী উন্নয়ন করেছি পৌরবাসীই ভালো বলতে পারবেন। নির্বাচনের বড় বিচারক জনগণ। দল ও জনগণ চাইলে আবার নির্বাচন করব। এরই মধ্যে কেন্দ্র থেকে আসন্ন নির্বাচনে দলীয় সমর্থনের ব্যাপারে আনোয়ার আলী সবুজসংকেত পেয়েছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

সম্প্রতি তার সঙ্গে দলের শীর্ষ নেতাদের একাধিক বৈঠক হয়েছে বলেও শোনা গেছে। যদিও স্থানীয়ভাবে নিজ দলেই রয়েছে আনোয়ার আলীর বিরোধী পক্ষ। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাংসদ মাহবুবউল আলম হানিফের অনুগত জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি অংশ বর্তমান মেয়রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের এই অংশের সিনিয়র সহসভাপতি ও চেম্বারের সভাপতি হাজি রবিউল ইসলাম আসন্ন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় সমর্থন প্রত্যাশা করছেন। কয়েক বছর ধরে প্রচারে আছেন হানিফের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই নেতা। প্রার্থিতা ঘোষণায় পৌরবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও হানিফের ছবিসংবলিত ছোট ছোট বিলবোর্ড লাগিয়েছেন হাজি রবিউল। বর্তমান মেয়রের অধীনে কোনো উন্নয়ন হয়নি বলে দাবি করে তিনি বলেন, হানিফ ভাইসহ দলীয় নেতারা তাকে সমর্থন দেবেন বলে আশা করছি।

সব পক্ষের লোকদের নিয়ে নির্বাচন করতে চান তিনি। এদিকে হানিফের চাচাতো ভাই শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতাও দলীয় প্রতীক নিয়ে মেয়র পদে প্রার্থিতার আগ্রহ দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তে প্রার্থী বাছাই করা হবে। দল চাইলে আমি নির্বাচন করব। এ ক্ষেত্রে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামতও নিতে হবে। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের সমর্থন নিয়ে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে মাঠে নেমেছেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও চেম্বারের সহসভাপতি শেখ সাজ্জাদ হোসেন সবুজ। তবে গত দুই মাস ধরে তিনি নিখোঁজ আছেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন, জেলা আওয়ামী লীগে তীব্র গ্রুপিং রয়েছে। বর্তমান মেয়র প্রভাবশালী নেতা। তার নিজস্ব ভোট ব্যাংক আছে। দ্বন্দ নিরসন না হলে একক প্রার্থী দিয়েও লাভ নেই। অন্যদিকে, জেলা বিএনপি নেতারাও আগামী নির্বাচন উপলক্ষে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এক সময়ের ছাত্রলীগ নেতা ও বর্তমান শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কুতুব উদ্দিন, সদর থানা বিএনপির সহসভাপতি ও মজমপুর ইউপি চেয়ারম্যান বশিরুল আলম চাঁদ, যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও বর্তমান কাউন্সিলর মহিউদ্দিন খান মিলন এবং জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শামীমউল হাসান অপু মেয়র পদে প্রার্থিতার আগ্রহ দেখিয়েছেন।

সর্বশেষ নির্বাচনে আনোয়ার আলীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতা করে হেরেছিলেন কুতুব উদ্দিন। স্থানীয় সূত্র জানায়, কুষ্টিয়ায় বিএনপির সুদিন ফুরিয়ে গেছে। বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের কারণে বিএনপির অনেক ভোটও ক্ষমতাসীনদের পক্ষে চলে গেছে। এ ছাড়া মামলা-হামলায় কাবু জেলা ও উপজেলা বিএনপি দুর্বল হয়ে পড়েছে সাংগঠনিকভাবেও।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। জেলা বিএনপির সভাপতি মেহেদী রুমীর সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক সোহরাব উদ্দিন সমর্থকদের দ্বন্দ রয়েছে। মেহেদী রুমীর বিরুদ্ধে সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে রাজনীতি করার অভিযোগও উঠেছে। এ সব কারণে প্রার্থী বাছাই নিয়ে বিএনপি ঝামেলায় পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। মনোনয়ন প্রত্যাশী কুতুব উদ্দিন বলেন, আশা করি দলীয় সমর্থন পাব। দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে কাজ করছি।

যুবদল নেতা মিলন বলেন, আন্দোলনে ছিলাম। জেল খেটেছি। দল নির্দেশনা দিলে অবশ্যই নির্বাচন করব। স্বেচ্ছাসেবক দলের শামীমউল হাসান বলেন, কেন্দ্রীয় নেতারা ঠিক করবেন দলীয় প্রার্থী। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যতম শরিক জাসদ থেকেও মেয়র পদে প্রার্থী দেওয়া হতে পারে বলে শোনা গেছে। নাম শোনা যাচ্ছে জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক জিল্লুর রহমানের। যদিও জেলা জাসদের সভাপতি গোলাম মহসিন জানান, তাদের কোনো প্রার্থী মাঠে নেই।

তফসিল ঘোষণার পর দলীয় ফোরামে আলোচনা করে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে প্রার্থী দেবেন তারা। আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী বলেন, বড় দলে অনেক প্রার্থী থাকতেই পারেন। দলীয় সিদ্ধান্তে প্রার্থী নিশ্চিত হবে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সাংসদ সোহরাব উদ্দিন বলেন, এখনও কোনো নির্দেশনা আসেনি। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হবে।

এমএ