ঈদযাত্রায় দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন থামিয়ে পুলিশ ও বিভিন্ন সংগঠনের নামে চাঁদাবাজি চলছে। এইসব চাঁদাবাজিতে সড়ক-মহাসড়কে কৃত্রিম যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। ফেরিঘাটগুলোয় বসে থাকতে হচ্ছে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা। আর আকাশপথে ৪ থেকে ৫ গুণ বাড়তি দামে টিকিট কিনতে হচ্ছে। আকাশপথে ভাড়াসংক্রান্ত কোনো কার্যক্রম নেই। এইসব অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
শনিবার (১০ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে এক সংবাদ সম্মেলনে ঈদযাত্রা নিয়ে এইসব অভিযোগ করে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘হয়রানিমুক্ত নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রা নিশ্চিত করুন’শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলন করে তারা।
যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তার কারণে উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন থেমে থেমে চলছে। পথে পথে পশুবাহী ট্রাক থামিয়ে পুলিশ ও বিভিন্ন সংগঠনের নামে চাঁদাবাজি চলছে। এসব চাঁদাবাজিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে কৃত্রিম যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌ-রুটে ফেরিতে পার হতে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। দুর্ভোগ মাথায় করে প্রতিটি লঞ্চে ধারণক্ষমতার প্রায় তিন থেকে চার গুণ অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
লিখিত বক্তব্য দেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, সব পথে ভাড়া-ডাকাতি চলছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে সীমিত পরিসরে সড়ক, নৌ ও রেলপথে মনিটরিং টিমের কার্যক্রম থাকলেও আকাশপথে ভাড়াসংক্রান্ত কোনো কার্যক্রম নেই। ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চলসহ ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী প্রতিটি রুটে দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ ভাড়া বেশি আদায় করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে ভোলা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা রুটে দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, এই ঈদে ঢাকা থেকে ১ কোটি ৫ লাখ যাত্রী অন্য জেলায় যাতায়াত করবে। আর দেশব্যাপী এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যাতায়াত করবে আরও ৩ কোটি ৫০ লাখ যাত্রী। এবারের ঈদযাত্রার ১২ দিনে ৪ কোটি ৫৫ লাখ যাত্রী ২৭ কোটি যাত্রাবহরের সঙ্গে থাকবে।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, “এই সরকারের আমলে গত ১১ বছরে ২২টা ঈদ এসেছে। অথচ প্রতিবছর আমাদের একই প্রশ্ন তুলতে হয়। সারা বছর তো আর এত মানুষ একসঙ্গে যাতায়াত করে না। করে শুধু দুই ঈদে। কিন্তু সে ব্যবস্থাপনা কোথায়?”
গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আব্দুল হক বলেন, “দেশের গণপরিবহন খাতে এখন কৃত্রিমভাবে যানজট তৈরি করা হচ্ছে। হাইওয়ে পুলিশ থাকা সত্ত্বেও মহাসড়কে বাস-ট্রাক আটকে রেখে চাঁদাবাজি হচ্ছে। এটা সরকারের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ। মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে, পথে মানুষের মৃত্যু বাড়ছে। এর মতো ভয়াবহ অবস্থা কোনো সভ্য জনগোষ্ঠীতে হতে পারে না।”
যাত্রী কল্যাণ সমিতির সহ-সভাপতি তাওহীদুল হক বলেন, এবারের ঈদে ছুটি কম। যাত্রী কল্যাণ সমিতির সুপারিশ ও তথ্য-উপাত্ত নিয়ে সরকার পরিবহন খাতকে সাজানোর ব্যবস্থা নেবেন বলে তাঁর আশা।
ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে বেশ কিছু সুপারিশ দিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। এর মধ্যে রয়েছে- ১. সড়ক, নৌ ও আকাশপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য বন্ধ করা। ২. পশুবাহী ট্রাক থামিয়ে চাঁদাবাজি বন্ধ করা। ৩. সড়ক-মহাসড়কের উপর বসা পশুর হাট-বাজার উচ্ছেদ করা। ৪. টোলপ্লাজাগুলোর সবকটি বুথ চালু করা। ৫. যানজট প্রবণ এলাকায় দ্রুত গাড়ি পাসিং এর উদ্যোগ নেওয়া। ৬. মোটরসাইকেলে ঈদযাত্রা নিষিদ্ধ করা। বেপরোয়া বাইকারদের নিয়ন্ত্রণ করা। ৭. ফুটপাত পরিষ্কার রাখা, পথচারীদের হাঁটার পরিবেশ নিশ্চিত করা। ৮. পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপার নিশ্চিত করা। ৯. দুর্ঘটনা প্রতিরোধে স্পিডগান ব্যবহার, উল্টোপথে গাড়ি চলাচল বন্ধ করা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করা, মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিক্সা, ইজিবাইক, প্যাডেলচালিত রিকশা, অটোরিকশা, নছিমন-করিমন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ। ১০. রেলপথে টিকিট কালোবাজারী বন্ধ করা। ১১. ক্রাস প্রোগ্রামের মাধ্যমে সড়ক মহাসড়ক প্রতি ইঞ্চি অবৈধ দখল ও পার্কিং মুক্ত করা। ১২. নৌ-পথে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ করা।
এমবি





