শাহজাহানপুরে পরিত্যক্ত কূপ থেকে সাড়ে ২৩ ঘণ্টা পর শিশু জিহাদকে উদ্ধার ঘটনায় উদ্ধারকর্মীদের তৎপরতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিভিন্নজন ফায়ার সার্ভিসকর্মীদের উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে নানা প্রশ্ন, ক্ষোভ, সমালোচনা এবং শাস্তির দাবিও জানিয়েছেন তাদের ফেসবুকওয়ালে।
সাজিদ হাওলাদার নামের একজন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘রেশমা কিংবা জাহিদের মত আর কোন সাজানো অপরিপক্ক নাটক দেখতে চাই না। যে নাটকের শেষ হবার পরে কাহিনী শুরু হয়!’
সাদ্দাম হোসাইন নামের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থী লিখেছেন, ‘আমরা মর্মাহত। রেসকিউ টিমে যারা ছিল সবার এক বছরের বেতন কাটা হোক।’ তার এই স্ট্যাটাসে মন্তব্য করে তার এক ফেসবুক বন্ধু লিখেন, ‘punishment er prostab ato kom! Matro ak bocorer?’
এমডি ওয়ারেস নামে আরেক ব্যক্তি ফেসবুকে স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘সরকারি মাল দরিয়ামে ঢাল। কিন্তু জিহাদ তো সরকারি মাল না, সে জনগণের মাল এবং জনগণেই উদ্ধার করেছে। যারা হাল ছাড়েননি তাদের অভিনন্দন। আর যারা সমাপ্ত ঘোষণা করেছে তাদের (লেখারযোগ্য নয়) বড্ড আফসোস হচ্ছে আজ!’
খালিদ মাহমুদ সাদ নামে একজন সমালোচনা করে লিখেন, ‘ভুলের মাশুল দিল বাচ্চাটা। ভুল বলছি কারণ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যেভাবে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করলেন তা সন্দেহজনক...বাঙালির সান্ত্বনার দরকার নাই, বাচ্চাটার বাবা-মাকে শক্তি দাও আল্লাহ!’
এদিকে ঘটনাটির তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া সময় টেলিভিশনের প্রতিবেদক শেখ গোলামুন্নবি জায়েদ তার ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন তুলেছেন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে।
তিনি লিখেছেন, ‘জিয়াদ ও জিয়াদ তুমি শুনতে পাও? হ... রশি পাইছো? হ... আইচ্ছা তাইলে শক্ত কইরা ধরো...’
একেবারে পাশে থেকে ফায়ার সার্ভিসকর্মীদের এই কথোপকথন শুনেছি। জিয়াদের কণ্ঠ আমি শুনতে পাইনি। শুক্রবার সময় টেলিভিশনের সন্ধ্যা সাতটার সংবাদের সময় থেকে টানা লাইভ কাভারেজ শুরু করি।…এত নাটকীয়তার পর শিশু জিয়াদ উদ্ধার! সরকারের দায়িত্বশীল অনেকেই ঘোষণা দিলেন এটি গুজব!
আমি অবাক হয়েছি, আজ সে উদ্ধার হয়েছে; কিন্তু মৃত। কাল ফায়ার সার্ভিস ক্যামেরা দিয়ে দেখে সেখানে শুধু কর্কশিট, প্রাণের অস্তিত্ব বলতে শুধু টিকটিকি, তেলাপোকা আর ব্যাঙ। ফায়ারের ডিজি ও মাননীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যখন ঘোষণা দিলেন কোনো কিছু নেই। তার কিছুক্ষণ পর আমি ব্যক্তিগতভাবে ফায়ারের ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, প্রথম যখন ক্যামেরা পাঠানো হয়েছিল সেই রেকর্ডে তিনি শিশুর কান্না শোনার কথা স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু এখন কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
নিজেকে মনে হচ্ছিল ভুল করছি। অসত্য সংবাদ প্রচার করেছি হয়তো। কিন্তু আমরা যা বলেছি সবই সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থার পক্ষ থেকে সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতেই বলেছি। আমরা তাদেরই লাইভ টেলিকাস্টে নিয়ে এসেছি তারা সেখানেও বলেছেন যে, শিশু জিয়াদ কথা বলেছে, রশি আঁকড়ে ধরেছে, কান্নাকাটি করেছে। কিন্তু যখন ঘোষণা আসল গুজব! তখন ওই বক্তাদের ভুয়া ভাবার আগে নিজেই নিজেকে নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলাম। শিশুর মায়ের কান্না, আকুতি, বাবার কান্না, দোয়া চাওয়া এগুলোর কারণে বিশ্বাস করা কঠিন ছিল।
আমি বলতে চাচ্ছি আজও যখন তিনি সমাপ্তি ঘোষণা দিলেন তখনও তাকে সন্দিহান দেখা গেছে। আমি বলতে চাই কেন বলা হল ৩০০ ফিট গভীর, ৪৫০ ফিট গভীর, ৬০০ ফিট গভীর, ৬৭২ ফিট গভীর। উদ্ধার করার সক্ষমতা নেই বলে কি গভীরতাও মাপতে পারবেন না?
ক্যামেরায় ২৪০ ফিট নিচে কর্কশিট দেখলেন তার নিচে দেখা যায়নি। সাবমারসিবল পাইপটি তোলার পর জিয়াদের সাড়া-শব্দ আর পাওয়া যায়নি। বুঝলাম সে কথা। অক্সিজেন সরবরাহ কেন বন্ধ রেখেছিলেন? আজকে তাকে আমরা জীবিতই পেতাম যদি সেটি অব্যাহত রাখা হতো। বলতে চাই আমি যখন সরাসরি সম্প্রচারে ছিলাম তখন প্রতিটি আপডেট দিচ্ছিলাম তখন জিয়াদের কথা, তার সাড়া দেওয়ার কথা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাই আমাদের জানাচ্ছিলেন।
দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিরা কোনো কাজে সফল না হলে বা রাজনীতির স্বার্থে এভাবেই মানুষকে নাই করে দেন। যেমনটি দেখেছি, মাওয়ায় পিনাক-৬ ডুবে যাওয়ার ক্ষেত্রে। এক লঞ্চভর্তি যাত্রী উধাও!
কিন্তু সেখানে দেখেছি, স্থানীয়ভাবে চেষ্টা করেছেন অনেকেই, বলেছেন তারা পেয়েছেন। কিন্তু তাদের সহযোগিতা করেননি। আর উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হল। এখানেও শাহজাহানপুরে ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকেই অনেক কিছু করতে চেয়েছেন, সহায়তা পাননি। পরে সমাপ্ত ঘোষণার পর ঠিকই স্বেচ্ছাসেবীরা জিয়াদকে তুলে এনেছেন। আমার প্রশ্ন—
১. কেন কূপের গভীরতা মাপার ক্ষমতা আপনাদের নেই?
২. পরে কেন অক্সিজেন বন্ধ করে তাকে মেরে ফেলা হলো?
৩. ফায়ার সার্ভিস বলল শেষে ক্যাচার দিয়ে তারা যা পাবেন সব তুলে ফেলবেন! কই?
৪. সমাপ্তি কার স্বার্থে ঘোষণা? কেন বললেন, কিছু নেই?। কান্না তো আপনারাই শুনেছেন?
৫. কেন বললেন গুজব? কেন পুলিশ দিয়ে তার বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো? ছি! আপনার সন্তান হারালে? আপনাকে যদি পুলিশ নিয়ে যায়?
৬. ওয়াসার কূপটি কেন খোলা ছিল?
আপনাদের সর্বোচ্চ চেষ্টার কথা কিন্তু আমরা বার বার বলেছি, আপনাদের ওপর মানুষ ভরসা করে, আশা করে। কার স্বার্থ থাকে এ সবের ক্ষেত্রে। বলতে চাই সব সরকারই একই রকম কাণ্ড করে থাকে কেন?
ভাবুন! বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে কারা? আপামর জনসাধারণ। হ্যাঁ, সাথে বাঙালী ডিফেন্সের লোকজন ছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও সহায়তা ছাড়া সেটি সম্ভব ছিল না। এরপরও এ দেশের মানুষ নানা রকম জীবন সংগ্রাম করে এগিয়ে যাচ্ছে। বলতে চাই সাহসী এ জাতিকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করলে সবক্ষেত্রে সফল হবেন। আপনাদের কাজের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ত করুন। দেশ ও জাতি লাভবান হবে।
জেএ





