আমার জীবনের চেয়ে চাকুরি আমার কাছে অনেক বড়। পাঁচ মিনিটের রাস্তা পার হওয়ার জন্য জীবন চলে গেলে কি করব ভাই? আমার কাছে বর্তমান জীবনের চেয়ে চাকুরী অনেক বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার অফিসের সময় সকাল ১০ টায়, অফিসে র্কাড পান্স করতে হবে  ১০টা ১০ মিনিটের মধ্যে  । এমনিতেই আজ একটু লেট করে ফেলেছি । আর  তিন দিন ১ মিনিট করে লেট হলে, আমার একদিনের বেতন কেটে নেওয়া হবে। বেতন পাই আর কত টাকা। তার মাঝে মা-বাবা-ছেলে-মেয়ে-ভাই-বোন আর বউয়ের দায়িত্ব তো আছে কাঁধে । একজনের চুকুরীর টাকা খায় ৮ জন। আর এই চাকুরীটা হল ৮ জনের রিজিকের রাস্তা।

কথাগুলো গড় গড় করে বলছিলেন অফিসগামী অমিত হাসান। রোববার (৮ এপ্রিল) সকালে মহাখালীর পুলিশ বক্স এর সামনের ফুটওভার ব্রীজের উপর দিয়ে পার না হয়ে হেটে রাস্তা পার হতে গিয়ে প্রায় মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও কোনমতে  বেঁচে যান অমিত। সামনের দিক থেকে হাত জাগিয়ে রাস্তা পার হতে যাচ্ছিলেন তিনি। এমন সময় উল্টা দিক থেকে একটা লেগুনা চলে এলো , সামনে ছিল প্রাইভেটকার।  সামনের প্রাইভেট কার তাৎক্ষণিক ব্রেক কষলো আর লেগুনাটা রোডের আইল্যান্ড এর ওপর উঠিয়ে দেয়। দুই গাড়ির চাপে রাস্তায় পড়ে যাওয়া লোকজন অমিত হাসানকে পথচারিরা ধরে উঠালো। কেউ কেউ ভাবলেন তিনি হয়তো মারা গিয়েছেন।

এমনই এক প্রেক্ষাপটে অমিত হাসানকে এই প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয়, ভাই আপনি কেন এত তাড়াহুড়ো করে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। অমিত উত্তরে জানান, ভাই আমার জীবনের চেয়ে চাকুরি অনেক বড়। আমি অনেক কষ্ট করে এই চাকুরির ব্যবস্থা করছি। বাড়িতে আমার মা বাবা দুইজনেই খুব অসুস্থ। আমি গত দুদিন একটু লেট করে ফেলছি আজও যদি লেট করি তাহলে আমার বেতন হতে ৫০০ টাকা কেটে নেওয়া হবে। তাই আমি এত তাড়াহুড়ো করে  রাস্তা পার হচ্ছিলাম। এখন বাজে ১০টা আর আমার হাতে আছে মাত্র ১০ মিনিট, এই ১০ মিনিটের মধ্যে আমাকে অফিসে ঢুকতে হবে ।

অমিত আরো জানান, আমার বাসা বাড্ডা লিংক রোডে। সকাল ৯টায় বের হয়েছি। এতটুকু পথে  সময় লেগেছে ১ ঘন্টা, তাও আবার মহাখালী টিভিগেট হতে হাঁটতে হাঁটতে এসেছি ,অফিসের আর মাত্র ১০ মিনিট সময় বাকি আছে। এই ১০ মিনিটের ভিতরে আমাকে অফিসে উপস্থিত হতে হবে। ঘটনা সূত্রে জানা যায়, অমিত হাসান একটা র্গাড কোম্পানীর সিকিউরিটির ইনচার্জ। তিনি বেতন পান ১৫ হাজার টাকা । এই টাকা দিয়ে তিনি এই ৮ জনের সংসার চালান। তার বাবা-মা দুইজনেই খুবি অসুস্থ, ভাই বোনের লেখা-পড়ার খরচ এবং তার ছেলে মেয়ের লেখা-পড়ার সব খরচ চালাতে হয় তাকে।

ঢাকা শহরে এভাবেই প্রতিদিন অমিতের মতো লাখ লাখ অফিসগামী একইভাবে রাস্তায় চলাচল করেন। ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হন। একদিনে রাস্তায় যানজট, অন্যদিনে ফুটওভার ব্রিজের অবস্থান সবমিলিয়ে পথচারিরা খুব কমই রাস্তা পার হতে খুব কমই ব্যবহার করেন ফুটওভার ব্রিজ কিংবা আন্ডারপাস।  

এ বিষয়ে বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা হাফিজের মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের দেশের বড় সমস্যা হল দারিদ্রতা , একজনের ইনকামে চলে ৮-১০ জন। আর সে কারণেই যিনি চাকুরী করেন তার ঘাড়েই চাপে সমস্ত বোঝা। এমনই প্রেক্ষাপটে স্বল্প আয়ের এই চাকুরিজীবীরা প্রায় সবসময় নানা দু:চিন্তায় মগ্ন থাকেন। রাস্তাঘাটে চলাফেলার সময়ও তারা অনেক সময় থাকেন উদাসীন।

অধ্যাপক হাফিজ আরো জানান, আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর মারা যান ৩৫০ জনের মতো। এর মধ্যে ফুটওভার ব্রীজ ব্যবহার না করার কারণে ১৫০ থেকে ২০০ জনের প্রাণহানি ঘটছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সূত্রে জানা য়ায়, গত বছরে ওভার ব্রিজ ব্যবহার না করার জন্য জেল-জরিমানা করা হয়েছে ১৫৩ জনকে, এর মধ্যে ১৫ জনের ৬ মাসের কারাদন্ড দেয়া হয় । কিন্তু পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি নেই। থেমে নেই ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে নাগরিকদের বেপরোয়া রাস্তা পারাপার।

সরেজমিন দেখা যায়, ট্রাফিক পুলিশের সামনেই ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন পথচারীরা। পুলিশ নিরব হয়ে সেটা দেখছেন। কারণ পুলিশের হাতেও ক্ষমতা নেই যে যারা  ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার না হয়ে  সড়কের মাঝ দিয়ে হেঁটে রাস্তা পার হচ্ছেন তাদের দণ্ডিত করবেন। গত বছর (২০১৬) এই ব্যাপারে নাগরিকদের ২০০ টাকা করে জরিমানা এবং ছয় মাসের কারাদন্ড দেওয়ার আইন থাকলেও নাগরিকরা সচেতন হচ্ছেন না ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপির) কমিশনার বেনজীর আহমেদের নেতৃত্বে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হলেও এসব পদক্ষেপে কোন কাজ হয়নি বলেও মন্তব্য অনেকের । তারা বলেন , পুলিশের পাশ দিয়ে নাগরিকরা রাস্তা পার হন। কারণ সবার আগে প্রয়োজন নাগরিকদের নিজেদের প্রয়োজনেই সতর্ক হওয়া।  আর এটা যতদিন না হবে, ততদিন পুলিশ বা বিভিন্ন আইনশৃংখলা বাহিনী কিছুই করতে পারবেনা।  ফুটওভার ব্রিজ ও আইল্যান্ডেরপাস ব্যবহার না করে সড়ক পারাপারে শাস্তির বিধান থাকলেও এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা কালেভদ্রে প্রয়োগ করা হলেও এখন প্রর্যন্ত নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে নেয়া হয়নি কোন কার্যকর পদক্ষেপ।

 ভ্রাম্যমাণ আদালত  প্রসঙ্গে ডিএমপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, নাগরিকেরা যাতে রাস্তা  চলাচলের ক্ষেত্রে সচেতন হয়, সেই জন্য এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিলো। ফুটওভার ব্রিজ ও আইল্যান্ডেরপাস ব্যবহারে রাজধানীবাসীকে সচেতন করে ডিএমপি। ডিএমপি ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারের জন্য নানাভাবে প্রচারনা ও চালাচ্ছে।

এই ব্যাপারে সহকারী পুলিশ কমিশনার আলাউদ্দিন অহম্মেদ  টাইম নিউজবিডিকে বলেন, নাগরিকরা যদি হেটে রাস্তা পার হয় তাহলে  ট্রফিকের বিভিন্ন সমস্যা হয় । সাথে সাথে যানজটও বাড়ে এবং রোড় অ্যাক্সিডেন্ট ঘটে। এতে ট্রাফিকের কাজে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

ডিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার আরো বলেন, বর্তমান সড়কে বিশৃঙ্খলা চলছে। চালকদের অদক্ষতা এবং নাগরিকদের ফুটওভার ব্রীজ ব্যবহার না করার কারণে যানজট বাড়ে। একইসাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। তিনি বলেন, ফুটওভার ব্রিজ থাকা সত্বেও নাগরিকেরা যেখান দিয়ে ইচ্ছা রাস্তা পারাপার হচ্ছেন। এতে যানজটের পাশাপাশি সড়কে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারাও যাচ্ছেন।

সহকারী পুলিশ কমিশনার আলাউদ্দিন আর বলেন, ঢাকার মতো এত বড় সিটিতে শুধু পুলিশ দিয়ে, এই অবস্থা ও বিশৃঙ্খলা দূর করা সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে নাগরিকদের সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। তার মতে, বনানীর মতো সব ফুটওভার ব্রিজে চলন্ত সিঁড়ি বসাতে পারলে সবাই ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করবে বলে আশা করা যায়।

এই পুলিশ কর্মকর্তা মনে করেন, নাগরিকরা যদি দায়িত্ব সহকারে  ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করে তাহলে পঞ্চাশ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। বিপুল জনসংখ্যার ভারে বেসামাল হয়ে থাকা এই ঢাকা শহরে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধিসহ পরিস্থিতির উন্নয়ন শেষমেষ কতটা হয় তা দেখতে আরো অপেক্ষা করতে হবে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।

কেবি