আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে বগুড়ার নয়টি পৌরসভায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ভোটের লড়াই বেশ জমে উঠেছে। এই লড়াইয়ে বেশিরভাগ পৌরসভাতেই নৌকাকে পেছনে ফেলে অনেকটাই এগিয়ে গেছে ধানের শীষ। তবে দুই দলেরই মর্যাদার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিবন্ধন হারানো জামায়াতে ইসলামী। দলটির ভোট ব্যাংক আওয়ামী লীগ-বিএনপির প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, বগুড়া পৌরসভায় বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী বর্তমান মেয়র অ্যাডভোকেট একেএম মাহবুর রহমানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম মন্টু। বিএনপি প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ সঙ্কট থাকলেও ধানের শীষের কল্যাণে ভোটের লড়াইয়ে তিনিই এগিয়ে আছেন। অন্যদিকে ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার সামছুল হক ভোটের লড়াইয়ে উঠে আসতে পারেননি।

শেরপুর পৌরসভায় বিএনপি প্রার্থী বর্তমান মেয়র স্বাধীন কুমার কুণ্ডু জনমতে এগিয়ে রয়েছেন। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে বিএনপির সবগুলো পক্ষ একসঙ্গে কাজ করায় ধানের শীষের জয়ের সম্ভাবনা প্রবল হয়েছে। তবে জামায়াতের বিশাল ভোট ব্যাংক ধানের শীষের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে স্থানীয় ভোটাররা জানিয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগের আব্দুস সাত্তার অবিরাম প্রচারণা চালালেও দলীয় কোন্দলে সুবিধা করতে পারছেন না।

কাহালু পৌরসভায় বিএনপি-আওয়ামী লীগে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান মেয়র হেলাল উদ্দিন কবিরাজের সঙ্গে সমান তালে নির্বাচনী মাঠে প্রচারণা চালাচ্ছেন বিএনপি আব্দুল মান্নান ওরফে ভাটা মান্নান। তবে এ পৌরসভায় জামায়াতের স্বতন্ত্র প্রার্থী জহুরুল ইসলাম বাদশার কারণে অনেকটাই বিপাকে পড়েছে বিএনপি। বিগত উপজেলা নির্বাচনের সময় বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্কে যে অবনতি ঘটে তা আজও স্বাভাবিক হয়নি। ফলে জামায়াতের প্রার্থী এই পৌরসভায় মেয়র পদে জয়-পরাজয়ের মূল ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, জামায়াত শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠে থাকলে আওয়ামী লীগের বিজয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শেষ মুহূর্তে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সমঝোতা হলে ফলাফল পাল্টে যেতে পারে।

শিবগঞ্জ পৌরসভায় বিএনপির বিজয়ের পথে অন্তরায় দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। ইতোমধ্যেই বিএনপির জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মীর শাহে আলমের বিরুদ্ধে এই পৌরসভায় আওয়ামী লীগ মনোনীত তৌহিদুর রহমান মানিকের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে। মীর শাহে আলমের ইশারাতেই বিএনপি প্রার্থী মতিয়ার রহমানের বিপক্ষে তাজুল ইসলাম বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন এমন কথাই ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটানো সম্ভব না হলে এই পৌরসভায় মেয়র পদ হারাতে পারে বিএনপি।

নন্দীগ্রাম পৌরসভায় দলীয় প্রার্থীর সঙ্গে বিএনপির বিদ্রোহীর তুমুল লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপি প্রার্থী বর্তমান মেয়র সুশান্ত কুমার শান্তর সঙ্গে বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক মেয়র কামরুল হাসান জুয়েলের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর অবস্থান মোটেও ভালো নয় বলে ভোটাররা জানিয়েছেন। জামায়াতের বিপুল সংখ্যক রিজার্ভ ভোট মেয়র পদে জয়-পরাজয়ে ভূমিকা রাখবে এখানেও।

ধুনট পৌরসভায় আওয়ামী লীগের কোন্দলের সুযোগ নিতে পারে বিএনপি। আওয়ামী লীগের বর্তমান মেয়র জিএম বাদশার পরিবর্তে শরিফুল ইসলামকে মনোনয়ন দেয়ায় তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। এই পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন সাবেক মেয়র আলীমুদ্দিন হারুন। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জিএম বাদশার সঙ্গে বিএনপির আলীমুদ্দিন হারুনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে এখানে।

সারিয়াকান্দি পৌরসভায় ফাঁকা মাঠে গোল দিতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আলমগীর শাহী সুমন। বাছাইয়ে বিএনপি প্রার্থীসহ শক্তিশালী তিন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়। এজন্য আওয়ামী লীগ প্রার্থী সুমনকেই দায়ী করা হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্টে রিট করে সবাই প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার ভোটের হিসাব পাল্টে গেছে। এখানে বর্তমান মেয়র বিএনপি প্রার্থী টিপু সুলতানের জয়ের প্রবল সম্ভাবনার কথা বলছেন ভোটাররা। আওয়ামী লীগ প্রার্থী আলমগীর শাহী সুমনের সঙ্গে তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

গাবতলী পৌরসভায় বিএনপি মনোনীত বর্তমান মেয়র সাইফুল ইসলাম সাইফের মূল প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগের মোমিনুল হক শিলু। তবে ভোটের লড়াইয়ে ধানের শীষের জয়ের পাল্লাই ভারী।

সান্তাহারে বিএনপি মনোনীত বর্তমান মেয়র তোফাজ্জল হোসেন ভু্ট্টো এবং আওয়ামী লীগের রাশেদুল ইসলাম রাজার মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নিশ্চিত হতে পারে বলে ভোটাররা জানিয়েছেন।

জেলার যে নয়টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেসব এলাকায় বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতেরও বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে। তাই এবারের নির্বাচনে জামায়াতের ভোট কে পাবে সেটা দেখার বিষয়। সরকারের জুলুম-নিপীড়ন এবং ২০ দলীয় জোটের শরীক হিসেবে জামায়াতের ভোট বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে স্থানীয় বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যকার বৈরী সম্পর্ক বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে নয়টি পৌরসভার কোনোটিতেই মেয়র এবং কাউন্সিলর পদে জামায়াতকে ছাড় দেয়নি বিএনপি। এ কারণে বিএনপির প্রতি চরম ক্ষুব্ধ জামায়াত। এই বিরোধের সুযোগ কাজে লাগিয়ে জামায়াতের ভোট টানার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। এই চেষ্টায় সফল হলে বেশ কয়েকটি পৌরসভায় বিএনপির নিশ্চিত বিজয় হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এমএইচ