জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে (জামুকা) ১৩ বছরের কম বয়সী মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স প্রমার্জনের হিড়িক পড়েছে। সম্প্রতি এ ধরনের ২৪ ব্যক্তির এক মাস থেকে শুরু করে দুই বছর পর্যন্ত বয়স প্রমার্জন করা হয়েছে। প্রক্রিয়াধীন রয়েছে আরও ৪০টি আবেদন। অথচ জামুকার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যাদের বয়স ১৩ বছরের কম, তাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই। খবর যুগান্তর।

জামুকায় গণহারে বয়স প্রমার্জনের বিরোধিতা করেছেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের মতে, দু’একটি এ ধরনের বিশেষ ঘটনা থাকতে পারে, ব্যাপক হারে নয়। সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতেই এ ধরনের সংস্কৃতি চালু হয়েছে। জামুকা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক যুগান্তরকে বলেন, নানা কারণে অনেকে ওই সময় বয়স কম দেখিয়েছিল। যারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তাদের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই বয়স প্রমার্জনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আবেদন যে কেউই করতে পারে, তবে তা যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের আবেদনই বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে।

৩১ মে অনুষ্ঠিত জামুকার ৩০তম বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বনিু বয়স ১৩ বছর করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তাতে বলা হয়-‘‘মুক্তিযোদ্ধার সর্বনিু বয়স ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তারিখে ১৩ বছরের কম কোনোভাবে বিবেচনার সুযোগ নেই।

তবে ওই তারিখে ১৩ বছরের ২-৩ মাস কমবয়সী কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভারতীয় তালিকা/লাল মুক্তিবার্তায় নাম থাকলে আবেদনভিত্তিক বাস্তবতা যাচাই করে বয়স প্রমার্জনের বিষয়টি জামুকা সভায় উপস্থাপনপূর্বক বিবেচনা করা যেতে পারে।’’

২০ সেপ্টেম্বর জামুকার ৩২তম সভায় ১১টি আবেদন উপস্থাপন করা হলে তাদের বয়স প্রমার্জনের ক্ষমতা জামুকার চেয়ারম্যান ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীকে দেয়া হয়। পাশাপাশি লাল মুক্তিবার্তায় উল্লিখিত মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স প্রমার্জনের জন্য সাবেক চিফ হুইপ মো. আবদুস শহীদকে প্রধান করে ৫ সদস্যের সাব কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্য সচিব করা হয় জামুকা ডিজিকে।

সাব কমিটি ১৫ নভেম্বরের বৈঠকে সেই ১১ আবেদনসহ ৩২টি আবেদন উপস্থাপন করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে কমিটির পক্ষ থেকে ২৪ জনের বয়স প্রমার্জনের সুপারিশ করা হয়। এদের মধ্যে সর্বোচ্চ এক বছর ১১ মাস ৪ দিন বয়স প্রমার্জন করা হয় যশোরের সিদ্দিকুর রহমানকে।

পাশাপাশি কুড়িগ্রামের মনিরুল হক প্রধানের এক বছর ৯ মাস ৪ দিন, ঝিনাইদহের মো. তোফাজ্জেল হোসেনের এক বছর ৪ মাস ও জামালপুরের তোফাজ্জল হোসেনের এক বছর ৩ মাস ১৭ দিন প্রমার্জন করা হয়। গাজীপুরের আবদুস সোবহানের ১১ মাস ২৫ দিন, মাগুরার বিশ্বাস আবদুস সাত্তারের ১১ মাস ৫ দিন, কুষ্টিয়ার আবদুল্লাহর ৯ মাস ৯ দিন, কুমিল্লার আবুল হোসেন মিয়াজীর ৮ মাস ১৪ দিন, ঠাকুরগাঁওয়ের এ কে এম মনজুর রহমানের ৪ মাস ২ দিন, ঝিনাইদহের আবদুল গফুর মৃধার ৩ মাস ১৪ দিন, ইসরাইল হোসেনের ৩ মাস ৯ দিন, কুষ্টিয়ার নুরুল ইসলামের ৩ মাস ৭ দিন, ঢাকার মো. নাজিম উদ্দিন, মানিকগঞ্জের সারোয়ার হোসেন ও বরগুনার সালেহ উদ্দিনের ৩ মাস ৪ দিন প্রমার্জনের সুপারিশ করা হয়। এছাড়া ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে মুন্সীগঞ্জের আমির হোসেন মুন্সী, বগুড়ার মোস্তাফিজুর রহমান, ঝালকাঠির মো. নুরুল আলম আকন্দ, ঝিনাইদহের মনোয়ার হোসেন ও মতিয়ার রহমান, নাটোরের রুহুল আমীন, যশোরের শহিদুল ইসলাম, জামালপুরের সাজেদুল করিম এবং ঝিনাইদহের আমজাদ হোসেনের বয়স প্রমার্জনের সুপারিশ করা হয়েছে।

বাকিদের আবেদন ফেরত পাঠানো হয়। এ ২৪ জনের বিষয়টি ১৭ নভেম্বর জামুকার ৩৩তম বৈঠকে অনুমোদন দেয়া হয়।

এর আগে ২৩ মার্চ জামুকার ২৯তম সভায় ১১ ব্যক্তিকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরা হলেন-যশোরের হাসানুল বারী, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার মিজানুর রহমান, গাজীপুরের মোজাম্মেল হক, ঢাকার এসএম আবদুল ওয়াহাব, রাজবাড়ীর আবদুল কাদের মোল্লা, সাতক্ষীরার ইমতিয়াজ আহম্মদ, গাইবান্ধার আবদুল কুদ্দুস আলী, গোপালগঞ্জের হেমায়েত উদ্দিন, ঢাকার কৃষ্ণকুমার ঘোষ, লালমনিরহাটের আমির হোসেন এবং লক্ষ্মীপুরের মো. হানিফ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামুকার একাধিক সদস্য জানান, বৈঠকে ১১ আবেদন উপস্থাপনের কথা থাকলেও জামুকার ডিজি এক মহলের প্ররোচনায় ৩২টি আবেদন উপস্থাপন করেন।

অনেকে ক্ষুব্ধ হয়ে ডিজির কাছে কৈফিয়ত চান। তাৎক্ষণিকভাবে তারা সম্মতি দিলেও পরে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর কিভাবে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা তৈরি হয়। আহতরা এতদিন কোথায় ছিলেন? এভাবে গণহারে বয়স প্রমার্জন করা হলে এটি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জামুকার মহাপরিচালক (ডিজি) মাহফুজার রহমান সরকার যুগান্তরকে বলেন, বয়স প্রমার্জনের বিষয়টি চূড়ান্ত করে জামুকার ৯ সদস্যের কমিটি।

আমার কাজ সাচিবিক সহায়তা দেয়া। আবেদনগুলোতে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশ রয়েছে। নথি উপস্থাপন করতে বলা হলে আমার কিছু করার থাকে না। বয়স প্রমার্জনের আরও ৪০টি আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে। জানতে চাইলে সাবেক সেনাপ্রধান ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের মহাসচিব লে. জে. (অব.) হারুন অর রশীদ রোববার যুগান্তরকে বলেন, যারা স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার আবেদন করছেন তাদের উদ্দেশ্য সহজেই অনুমান করা যায়।

সরকারের দেয়া আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়াই তাদের লক্ষ্য। নইলে এত বছর পর কিভাবে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায়। ১৩ বছরও প্রমার্জন চায়? যারা এগুলো যাচাই-বাছাই করছেন তারাই বা কিভাবে এসব বিবেচনায় নিচ্ছেন। বিষয়গুলো জাতির সামনে তুলে ধরা উচিত।

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় কমিটির মহাসচিব (কল্যাণ ও পুনর্বাসন) আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী বীরপ্রতীক যুগান্তরকে বলেন, দু’একটি স্পেশাল কেইস থাকতে পারে। যেমন- টাঙ্গাইলের গোপালপুরের শহিদুল ইসলাম বীরপ্রতীক। যার যুদ্ধকালীন বয়স ছিল ১২ বছর।

বঙ্গবন্ধু নিজে তাকে বীরপ্রতীক উপাধি দিয়েছেন। সেটা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক। কিন্তু ৪৪ বছর পর কিভাবে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সম্ভব তা আমার বোধগম্য নয়। আর বয়সই বা এত প্রমার্জন করতে হবে কেন? এ প্রবণতা রোধ করতে হবে এবং সংশ্লিষ্টদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত।

এআই