নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের বট গ্রাম ও তার আশপাশের এলাকা শোকে স্তব্ধ। একটি মুঠোফোন ছিনতাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছিনতাইকারী দক্ষিণ আবির পাড়া (তথার খিল) গ্রামের জাফর আহাম্মেদের ছেলে ও এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী সাহেদ বাহিনীর প্রধান সাহেদ ও তার ছোট ভাই শান্ত এবং সাহেদ বাহিনীর লোকজন বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে বট গ্রামের বাসিন্দা সাহাব উদ্দিন মাষ্টারের ছেলে ও নোয়াখালী সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গণিত বিভাগের সম্মান তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আসিফ উদ্দিন শান্তকে নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করে।
দেশজুড়ে টার্গেট কিলিং মিশন, জঙ্গি ও সন্ত্রাস বিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার মধ্য রাতে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে লোকজনের সামনে গুলি করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের সন্ত্রস বিরোধী অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দেখা দিয়েছে। শান্ত হত্যা ঘটনায় শোকে মাতম তার পরিবার। শান্তর বাবা সাহাব উদ্দিন মাষ্টার ও মা হাসিনা আক্তার পুত্র শোকে পাগল প্রায়।
গত ৩ দিন যাবত তারা নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়ে ছেলে অকাল মৃত্যুতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ সন্ত্রাসী সাহেদ, তার ছোট ভাই, সন্ত্রাসী শান্ত ও অপর সন্ত্রাসীদের কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারে নি। এতে করে চরম হতাশা ও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারে। খুনের ঘটনায় তিন দিন পেরিয়ে গেলেও খুনিদের কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় সন্ত্রাসীদের ভয়ে থানায় মামলা দায়ের করতে সাহস পাচ্ছেনা নিহতে পরিবার।
সোনাইমুড়ী উপজেলার বট গ্রামের বাসিন্দা ও যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নিজ উপজেলা কোম্পানীগঞ্জের পেশকার হাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক সাহাব উদ্দিন মাষ্টারের ছোট ছেলে অষ্টম শ্রেনীর শিক্ষার্থী শাওন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাড়ীর পাশের সড়কে বসে মুঠোফোনে গেইম খেলছিল। এ সময় সোনাইমুড়ী উপজেলার দক্ষিণ আবিরপাড়া গ্রামের জাফর আহমেদের ছেলে ও এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী অস্ত্রবাজ সাহেদ বাহিনীর প্রধান সাহেদ, অপর একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সক্রিয় সদস্য আশরাফ সহ তিন সন্ত্রাসী মোটর সাইকেল যোগে ওই সড়ক দিয়ে যাচ্ছিল। শাওনকে দেখে সাহেদ মোটর সাইকেল থামিয়ে মোবাইল ফোনটি জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে শাওন দৌড়ে পাশ্ববর্তী মজিবুর রহমান খোকার বাড়ীতে আশ্রয় নেয়।
এ সময় সাহেদ ও তার সহযোগীরা শাওনকে ধাওয়া কর ওই বাড়ীতে ঢুকে তাকে মারধর করলে তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে সাহেদ ও তার সহযোগীদেরকে মারধর ও ধাওয়া করলে তারা পালিয়ে যায়। ওই ঘটনার জের ধরে সন্ত্রাসী সাহেদ, তার ছোট ভাই শান্ত এর নেতৃত্বে সাহেদ বাহিনীর ক্যাডার ও অপর সন্ত্রাসী গ্রুপের ২০-২৫ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী বৃহস্পতিবার রাত ১২টার সময় ওই বাড়ীতে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে এবং বসত ঘর কুপিয়ে ও পিঠিয়ে ভাংচুর করে।
এ সময় বাড়ীর লোকজনের সাথে শাওন এর বড় ভাই শান্ত এগিয়ে আসলে সন্ত্রাসীদের এলোপাতাড়ি গুলিতে ৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় শিক্ষার্থী আসিফ উদ্দিন শান্ত, মোহন, মনির, আশরাফুল ইসলাম ও শামছুল কবিরকে উদ্ধার করে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পথে শান্ত মারা যায়। তিনি পেটে ও বুকে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। অপর আহতদেরকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নিহত শিক্ষার্থীর স্বজন (মামা) হাবিবুর রহমান পিতা সাহাব উদ্দিন মাষ্টার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাহেদ এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, অস্ত্রবাজ ও বাহীনির প্রধান। সে এলাকায় অব্যাহত ভাবে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ এবং প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘুরাফেরা করলেও রহস্যজনক কারনে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাহেদ ও তার বাহিনীর লোকজনের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন না করায় এ নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তারা সন্ত্রাসী সাহেদ ও সহযোগীদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার দাবি করেছেন।
নিহত শান্ত'র পিতা সাহাব উদ্দিন মাষ্টার অভিযোগ করে বলেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় সন্ত্রাসীদের প্রথম দফায় হামলার পর বিষয়টি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন ভুঁইয়াকে মুঠোফোনে অবগত করে আইনি সহায়তা চাইলেও চেয়ারম্যান কোনো সহযোগিতা করেন নি।
তিনি আরো বলেন, চেয়ারম্যান আমার কথায় গুরুত্ব দিয়ে যদি থানা পুলিশকে অবহিত করতেন তাহলে আমার ছেলের অকাল মৃত্যু হতো না। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করলে তার পুরো পরিবারের লোকজনকে হত্যার আশঙ্কায় এবং হত্যাকাণ্ডের তিন দিনেও খুনিদের কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় তিনি থানায় মামলা করতে সাহস পাচ্ছেন না।
ইউপি চেয়ারম্যান তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ এর ব্যাপারে বলেন, তিনি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন না। তাকেও এলাকায় বসবাস করতে হবে।
এ হত্যাকাণ্ডের পর বৃহস্পতি ও শুক্রবার রাত ও শনিবার দিনব্যাপি নোয়াখালী জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার একেএম জহিরুল ইসলামের নেতৃত্বে নোয়াখালী ডিবি পুলিশ ও সোনাইমুড়ী থানা পুলিশ এবং জেলার অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী যৌথভাবে সাহেদের গ্রামের বাড়ীতে অভিযান চালায়। তবে নিস্ফল এ অভিযানে সন্ত্রাসী সাহেদের বসত ঘর থেকে দুইটি এল,জি উদ্ধার ছাড়া কোন সন্ত্রাসী খুনী গ্রেপ্তার হয় নি।
নোয়াখালী জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার একেএম জহিরুল ইসলাম বলেন, সন্ত্রাসী সাহেদ ও তার সহযোগীদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে রয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি র্যাব-১১ সিপিসি-৩ লক্ষীপুর ক্যাম্পের সদস্যরা ও সন্ত্রাসীদের ধরতে মাঠে রয়েছেন। খুব শীঘ্রই খুনিরা পুলিশের ধরা পড়বে বলে তিনি আশাবাদী। এ ঘটনার পর ওই এলাকায় পুলিশ ও র্যাবের টহল জোরদার করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ করেন নি।
এমআইএস





