মানুষের উপেক্ষা আর প্রকৃতির রুদ্ররোষের শিকার হয়ে মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে আছে চরফ্যাশনের দুর্গত এলাকার আড়াই লাখ মানুষ।
বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পরিবারগুলোর পানিবন্দি দশা ৭ম দিনে পড়েছে। রান্নার উপায় না থাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং আবাসন সংকট মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু অঘোষিত এই বিপর্যয়ের খবর নানাভাবে প্রচারে আসলেও সরকারের উচ্চপর্যায়ে তেমন টনক নড়েনি। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সরকারি ভাবে ৪০ মেঃ টন জিআর চাউল ও চরফ্যাশন উপজেলা পরিষদ থেকে আড়াই লাখ টাকা বরাদ্দ ছাড়া কিছুই মেলেনি। বেসরকারিভাবেও কোন সাহায্য পায়নি দুর্গতরা। অথচ একটানা ৭ দিন খেয়ে না খেয়ে থাকা দুর্গত পরিবারগুলোর মধ্যে হাহাকার শুরু হয়েছে।
বন্যাদুর্গত এলাকাগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জোয়ারের মাত্রা আরো বেড়েছে। বাতাসের চাপ, বৃষ্টি ও নতুন করে প্লাবিত এলাকা বাড়ছে। ফলে দুর্গতদের দুর্ভোগ আরো দীর্ঘস্থায়ী এবং চরম আকার নিতে যাচ্ছে।
এদিকে বুধবার প্লাবন দুর্গত মানুষের মাঝে উপজেলা পরিষদ থেকে বরাদ্দকৃত আড়াই লাখ টাকা ত্রাণ হিসেবে বিতরণ শুরু হয়েছে। উপজেলা পরিষদের হিসাব অনুযায়ী পূর্ণিমার প্রবল জোয়ারে চরফ্যাশনের আড়াইলাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
চরফ্যাশনের পূর্বাঞ্চলে মেঘনার ভাঙনে বিলীন বেড়িবাঁধ পুনঃনির্মাণ না করায় গত শুক্রবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পূর্ণিমার প্রভাবে প্রবল বেগে জোয়ারে উপজেলার পূর্বাঞ্চলের মাদ্রাজ, আসলামপুর, জিন্নাগড়, হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের ৩৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। একই সাথে বেড়িবাঁধ না থাকায় উপজেলার বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন ঢালচর, কুকরী ও মুজিবনগরের ৩৬টি গ্রামসহ বেড়ি বাঁধের বাইরের অংশ প্লাবিত হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রেজাউল করিম জানান, একটানা ৭ দিন ধরে ক্রমে বাড়তে থাকা জোয়ারের তোপে এসব গ্রামের আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। প্লাবিত মাদ্রাজের মোহাম্মদপুর, পূর্ব মাদ্রাজ, চরনিউটন, কুকরী, ঢালচর, মুজিব নগর, হাজারীগঞ্জ’র বিভিন্ন গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একটানা প্লাবন আর জোয়ারের চাপে প্লাবিত বসত ভিটার মাটি সরে যাওয়ায় এসব এলাকার শত শত ঘর ধসে পড়তে শুরু করেছে। অপরদিকে প্লাবিত গ্রামগুলোতে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। মারা যাচ্ছে গবাদি পশু। ছড়িয়ে পড়েছে পানিবাহিত রোগ-ব্যাধি। অনাকাক্ষিত এই বিপর্যয়ের শিকার গ্রামগুলোর মানুষ ক্ষোভে ফুঁসছে। গ্রামবাসীর ক্ষোভ স্থানীয় সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতাদের উপর।
সরকারি দলের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বলছেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেই ভেঙে যাওয়া বাঁধ সঠিক সময়ে নির্মাণ কাজ শুরু বা শেষ করা হয় নি। ফলে হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগ ও সীমাহীন ক্ষতির শিকার হয়েছে।
এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী কায়সার আলম দুর্ভোগ ও দুর্গতির জন্য স্থানীয় লোকজনকে দায়ী করে বলেছেন, জমি মালিকদের বাধার কারণে সঠিক সময়ে বাঁধ পুনঃনির্মাণ কাজ শুরু করা যায় নি। ফলে বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে পড়েছে। পূর্ণিমার একটানা ভারী জোয়ারে বিপর্যয় জটিল রূপ নিয়েছে।
চরফ্যাশনের প্লাবিত ৭২টি গ্রামের ৫০ হাজার পরিবারের ঘর ভিটার উপর দিয়ে ঢেউ খেলে যাচ্ছে জোয়ারের পানি। পানিবন্দি এসব পরিবারে রান্না হচ্ছে না ৭দিন ধরে। প্লাবিত এসব গ্রামগুলোর কাঁচা ও পাকা রাস্তাগুলোর উপর দিয়ে প্রবল বেগে জোয়ারের পানি গড়িয়ে পড়ায় রাস্তাগুলো ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মসজিদ-মাদরাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিতর পানি থৈ থৈ করছে।
ভোলা জেলা প্রশাসক মোঃ সেলিম রেজা, চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রেজাউল করিম গত সোমবার দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানান, চরফ্যাশনের আড়াইলাখ দুর্গত মানুষের জন্য উপজেলা পরিষদ থেকে জনপ্রতি একটাকা হারে আড়াইলাখ টাকা ও সরকারি জরুরি ত্রাণ সহায়তার আওতায় বুধবার ৪০ মেঃটন জি, আর বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ওই বরাদ্দকৃত জি, আর-এর মধ্যে বুধবার দুর্গত হাজারীগঞ্জ, আছলামপুর, মুজিব নগর, ঢালচর ও কুকরী ইউনিয়নে ৩ মেঃ টন করে ১৫ মেঃটন, জিন্নাগড় ইউনিয়নে ১ মেঃ টন ও বেশি দুর্গত এলাকা চরমাদ্রাজে ২০ মেঃটন জি, আর চাল বিতরণ করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া বাকি ৪ মেঃ টন জমা রাখা হয়েছে। এছাড়া উপজেলা পরিষদের দেয়া বরাদ্দের ৯০ হাজার টাকা চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের ১ শত ৮০ জন দুর্গত মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। বুধবার দুপুর সোয়া ১টায় চরমাদ্রাজ ইউনিয়ন পরিষদে এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
এসময় চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন আখন, চরমাদ্রাজের চেয়ারম্যান মোঃ জসিম উদ্দিন সরমানসহ ইউনিয়ন আ’লীগ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সূত্র: শীর্ষ।
ঢাকা, ১৭ জুলাই(টাইমনিউজবিডি.কম), এনএস





