মায়ের গর্ভে গুলিবিদ্ধ শিশুটির অস্ত্রোপচার সফলভাবে শেষ হলেও এখনো শঙ্কা কাটেনি। তবে শিশুটি দ্রুত সুস্থ হওয়ার জন্য তার মায়ের দুধের বিকল্প দেখছেন না চিকিৎসকরা।

তাদের দাবি, বুকের দুধ পান করাতে পারলে শিশুটি খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে।

এদিকে সন্তানের সান্নিধ্য পেতে সাত দিন পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে আসছেন শিশুটির মা নাজমা আক্তার। বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১টায় মাগুরা সদর হাসপাতাল থেকে একটি এ্যাম্বুলেন্সযোগে রওনা দিয়েছেন তিনি। সঙ্গে শিশুটির বাবা বাচ্চু ভূঁইয়াও রয়েছেন।

ঢামেক হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যপাক ডা. কানিজ হাসিনা (শিউলি) বলেন, ‘মায়ের দুধের বিকল্প নেই। আশা করছি, মায়ের বুকের দুধ পান করতে পারলে শিশুটি খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে।’

তিনি জানান, মায়ের বুকের দুধ না পাওয়ায় তাকে বুধবার গুঁড়াদুধ খাওয়ানো হয়েছিল। কিন্তু শিশুটি তা পেটে রাখতে পারেনি। বমি করে ফেলে দিয়েছে। পরবর্তীতে তাকে আর গুঁড়া দুখ খাওয়ানো হয়নি।

কানিজ হাসিনা বলেন, ‘বুধবার সফলভাবে অস্ত্রোপচার শেষ করেছি। তবে সে এখনো শঙ্কামুক্ত নয়।’

তিনি বলেন, ‘সামান্য জন্ডিস নিয়েই শিশুটি পৃথিবীতে এসেছিল। এখন জন্ডিসের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় তাকে স্পেশাল কেয়ার ইউনিটে (এনআইসি) রাখা হয়েছে।’

কানিজ হাসিনা বলেন, ‘রক্তের হিমোগ্লোবিন মাত্রা প্রতিটি শিশুর দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ থাকার কথা। কিন্তু বুধবার তার ৫০ হাজারে নেমে আসে। এর পর আমরা তার শারীরিক পরীক্ষা করি। পরীক্ষা রিপোর্টটি এখনো হাতে পাইনি।’

মেডিকেল বোর্ডের অন্যতম সদস্য শিশু সার্জারি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. আবদুল হানিফ টাবলু বলেন, ‘ডাক্তারা শিশুটির সার্বক্ষণিক মনিটর করছেন। তবে শিশুটিকে মায়ের বুধের দুধ খাওয়ানোটা জরুরী, মা পাশে না থাকায় বুকের দুধ খাওয়ানো সম্ভব হচ্ছে না।’

গত ২৩ জুলাই মাগুরা শহরের দোয়ারপাড় কারিগরপাড়ায় যুবলীগের দু’পক্ষের সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হন অন্তঃসত্ত্বা মা নাজমা আক্তার (৩৫)। গুলিটি মায়ের পেটে থাকা শিশুর শরীরেও বিদ্ধ হয়। এতে একটি গুলি শিশুটির পিঠ দিয়ে ঢুকে বুক দিয়ে বের হয়ে যায়। এতে তার হাত, গলা, চোখে আঘাত লাগে।

ঢামেকের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুটির শরীরের বুক, হাত, গলা ও চোখে জখমের চিহ্ন রয়েছে। চোখের আঘাত গুরুতর।

শিশুটির চিকিৎসার জন্য মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শিশু সার্জারির বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আশরাফ-উল-হককে প্রধান করে আট সদস্যবিশিষ্ট একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়।

কানিজ হাসিনা বলেন, ‘গঠিত বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বুধবার সকালে দুই ঘণ্টাব্যাপী অস্ত্রোপচার হয়েছে। তার শরীরের চারটি স্থানে ২১টি সেলাই দেওয়া হয়েছে।’

ডাক্তাররা কন্যাশিশুটির নাম দিয়েছেন ‘বুলেট বেগম’

সাত দিনেও কন্যাশিশুটির নাম রাখা হয়নি। মেডিকেলের খাতায় তার নাম দেওয়া হয়েছে বেবি অব নাজমা (নাজমার মেয়ে)। তবে চিকিৎসকরা তাকে ‘বুলেট বেগম’ নামে ডাকছেন।

শিশুটির নামের বিষয়ে কানিজ হাসিনা বলেন, ‘সাত দিনেও পরিবারের পক্ষ থেকে শিশুটির নাম নির্ধারণ করা হয়নি। তবে গর্ভে থাকতেই গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তাকে আমরা বুলেট বেগম নামেই ডাকছি।’

মামলা তুলতে পরিবারকে প্রতিপক্ষের হুমকি

সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হন নাজমার চাচাশ্বশুর মমিন ভূঁইয়া। তার ছেলে রুবেল ভূঁইয়া পরদিন ১৬ জনকে আসামি করে মাগুরা সদর থানায় মামলা করেন। মামলায় জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সুমনকে (৩২) প্রধান আসামি করা হয়। সুমন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শেখ রেজাউল ইসলামের আস্থাভাজন।

মামলা করার পর থেকেই সুমনের লোকজন রুবেল ভূঁইয়াসহ কন্যাশিশুটির বাবা বাচ্চু ভূঁইয়া ও চাচা যুবলীগ নেতা কামরুল ভূঁইয়াকে মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে বলে জানান শিশুটির ফুফু ‍শিউলি বেগম।

তিনি বলেন, ‘মামলা করার পর থেকে আমার চাচাতো ভাই রুবেল ভূঁইয়া ও আমার দুই ভাইকে মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। মামলা তুলে না নিলে তাদের প্রাণে মেরে ফেলবে।’

এ বিষয়ে মাগুরা পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসান উল্লাহ বলেন, ‘এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে পুলিশ তৎপর রয়েছে। একই সঙ্গে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এ ঘটানায় আমরা এরই মধ্যে দুই জনকে গ্রেফতার করেছি। আশা করছি, খুব দ্রুত বাকিদের গ্রেফতার করতে পারব।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, মাগুরা জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক পদের নির্বাচন নিয়ে শিশুটির চাচা যুবলীগ নেতা ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী কামরুল ভূঁইয়ার সঙ্গে অপর প্রার্থী আজিববর আলীর দ্বন্দ্ব হয়। এর জের ধরেই ২৩ জুলাই মাগুরা শহরের দোয়ারপাড় কারিগরপাড়ায় কামরুলের বাড়িতে হামলা চালান আজিববরের লোকজন। এতে সংঘর্ষের সৃষ্টি হলে কামরুলে ভাবী অন্তঃসত্ত্বা নাজমা আক্তার (৩৫) গুলিবিদ্ধ হন। উদ্ধার করে তাকে মাগুরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সেখানে অস্ত্রোপচার করে শিশুটি ভূমিষ্ঠ করেন চিকিৎসারা। শিশুটির অবস্থার অবনতি হলে ঢামেকে পাঠান।

এ ঘটনায় নাজমার চাচাশ্বশুর মমিন ভূঁইয়া গুলিবিদ্ধ ও বোমায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাগুরা সদর হাসপাতালে পরদিন মারা যান।

এএইচ