এবার কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনেছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। এরপর চড়া দামে লবণ কিনে সংরক্ষণ করেছেন। অথচ বিক্রি করতে গিয়ে হাটে কাঙ্ক্ষিত দাম মিলছে না। অনেকে কেনা দামের চেয়ে কম দামেই চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ কেউ ১৫০০ টাকায় চামড়া কিনে ৯০০ টাকায়ও বিক্রি করেছেন।
এমনই চিত্র দেখা গেছে খুলনা বিভাগের সবচেয়ে বড় ও দেশের অন্যতম বৃহত্তম পশু চামড়ার হাট যশোরের রাজারহাটে ঈদ পরবর্তী প্রথম হাটে গিয়ে। যারা দূর-দূরান্ত থেকে শনিবার এ হাটে চামড়া বিক্রি করতে আসেন তাদের অনেক বেশি লোকসান গুনতে হয়। অনেকে অর্ধেকের কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হন। কেউ কেউ গাঁটের টাকা খরচ করে চামড়া ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন।
১ হাজার ৩০০ পিস ছাগল ও ৭৫ পিস গরুর চামড়া নিয়ে যশোরের রাজারহাট মোকামে এসেছিলেন রাজশাহীর বানেশ্বর এলাকার চামড়া ব্যবসায়ী মোতালেব হোসেন। বাজারে চামড়ার দাম শুনে তিনি হতবাক। কেনা দামও মিলছে না। ১৩ হাজার টাকা পিকআপ ভাড়া করে নিয়ে এসেছেন চামড়া। বাড়ি ফিরতে ভাড়ার খরচ উঠাতে তিনি লোকসানে ১৫০ পিস ছাগল ও ১৫ পিস গরুর চামড়া বিক্রি করেছেন। বাকি চামড়া বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মোতালেব হোসেন জানান, ৯০-১২০ টাকা দরে প্রতি পিস ছাগলের চামড়া কিনেছেন। আর গরুর চামড়া কিনেছেন ১২০০-১৫০০ টাকা দরে। বাজারে ছাগলের চামড়া ৭৫ টাকা আর গরুর চামড়া ৯০০ টাকার বেশি দাম উঠছে না। তাই বাধ্য হয়ে তিনি পিকআপ ভাড়ার টাকা তুলতে গরুর কয়েকটি চামড়া ৯০০ টাকা করে বিক্রি করে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।
একই কথা জানালেন যশোরের ঝিকরগাছার ধল্লা নওয়াপাড়ার স্বার্থক মণ্ডল নামের এক চামড়া ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘দেড় হাজার টাকা দরে ৫০ পিস গরুর চামড়া কিনেছিলাম। সেই চামড়া ১ হাজার ১২৫ টাকায় বিক্রি করেছি। আর ৬০টি ছাগলের চামড়া প্রতি পিস ৮০-১০০ টাকা দরে কিনেছিলাম। এরমধ্যে ৩০টি ১০০ টাকা দরে বিক্রি করতে পেরেছি। বাকিগুলো অর্ধেক দামে বিক্রি করেছি।’
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ব্যবসায়ী নিমাই দাস জানান, তিনি এলাকায় ঘুরে ১৮০০-২০০০ টাকা দরে ২০০ পিস গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। সেই চামড়া সংরক্ষণে প্রায় ২০ হাজার টাকার লবণ লেগেছে। সব মিলিয়ে প্রতিটি চামড়ায় খরচ হয়েছে ২ হাজার ২০০ টাকা। বাজারে দেড় হাজার টাকার বেশি দর উঠছে না।
নিমাই দাস বলেন, ‘কেনা দাম না উঠলে বিক্রি করব না। স্থানীয় আড়তে মজুদ রেখে যাব। সুদে লোকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চামড়ার ব্যবসায় নেমেছি। লাভ না হলে পথে বসতে হবে।’
শুধু মোতালেব হোসেন, সার্থক মণ্ডল কিংবা নিমাই দাস নয় যশোরের রাজারহাটে চামড়া মোকামে আসা ক্রেতা-বিক্রেতাদের অধিকাংশ ধরাশায়ী হয়েছেন চড়া দামে চামড়া কিনে। স্থানীয় আড়তদাররা বলছেন, ট্যনারি মালিকেরা বকেয়া পাওনা পরিশোধ না করায় পুঁজি সংকট রয়েছে। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লবণের দাম। এ জন্য চামড়ার বেচাকেনায় ধস নেমেছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্ধারিত দামে তারা চামড়া কিনতে পারেননি। বেশি দামে চামড়া কিনেছেন। এরপর লবণের দাম বাড়ায় সংরক্ষণ খরচও বেড়েছে। সব মিলিয়ে চামড়ায় মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু বাজারে এসে দাম শুনে হতবাক হয়েছেন তারা।
যশোর নিউ মার্কেট এলাকার চামড়া ব্যবসায়ী সজীব দাস বলেন, ‘নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কেনা হয়েছে কাঁচা চামড়া। এ চামড়া সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ লবণ। সেই লবণের দাম আকাশছোঁয়া হওয়ায় বিপাকে পড়তে হয়েছে। গত বছর যে লবণ ৫৭০ টাকায় প্রতি বস্তা কিনেছি সেই লবণ এবার ১ হাজার ৬০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। চড়া দামে লবণ কিনে চামড়া সংরক্ষণ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মমিনুল মজিদ পলাশ বলেন, ‘ট্যানারি মালিকেরা বকেয়ার ২৫ শতাংশ টাকা পরিশোধ করেছেন। আড়তদারদের ৭৫ শতাংশ টাকা বকেয়া রয়েছে। পুঁজি সংকটে আড়তদাররা চামড়া কিনতে পারছেন না। এ জন্য চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে।’
বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল বলেন, ‘লবণ ছাড়া কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের কথা কল্পনা করা যায় না। চামড়া সংরক্ষণে লবণের সংকট দেখা দিয়েছে। শনিবার প্রতি বস্তা ১ হাজার ৬০০ টাকা দরে লবণ কিনেছি। বাড়তি দামে লবণ কিনে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে খরচ বেড়েছে। একইসঙ্গে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বাড়তি দামে কাঁচা চামড়া কিনেছি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বাড়তি টাকা ব্যয় করে চামড়া সংরক্ষণ করছেন। একইসঙ্গে ট্যানারি মালিকেরা বকেয়া পরিশোধ না করায় আড়তদাররা বিপাকে পড়েছেন।’
এম এ





