চারদিক পোড়া গন্ধ। ছড়ানো ছিটানো ছাই কয়লার স্তুপ। কয়েক জায়গায় এখনো ধোঁয়া উঠছে। আগুনের শিখা নিভে গেলেও তার ধ্বংস চিহ্ন এখনো স্পষ্ট।
আগুনে বাড়ি-ঘর হারিয়ে পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে আহাজারি করছে। কয়েক ঘণ্টা আগেও তাদের ছিল সাজানো সংসার। এখন সব জায়গায় শুধুই কয়লার স্তুপ। দেখলে মনে হবে যুদ্ধ বিধ্বস্ত কোন জনপদ।

কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা দূর্ঘটনা নয়। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র ধরে প্রতিপক্ষের লোকজনের ধরিয়ে দেয়া আগুনে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া গ্রামের চিত্র এখন এই রকমই। সোমবার রাতে বিবাদমান দুই পক্ষের সংঘর্ষের পর প্রকাশ্যে অগ্নিসংযোগে ১৭টি বসতঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ৫টি পাঠকাঠির গাঁদা সম্পূর্ণ ভষ্মীভূত হয়েছে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৩০ লাখ টাকার বেশি হবে বলে ফায়ার সার্ভিস বিভাগ জানিয়েছে।

দেখা গেছে, ১৫টি পরিবারের সদস্যরা খোলা আকাশের নিচে মানবেতর অবস্থায় রয়েছেন। এক কাপড়ে অর্ধাহারে অনাহারে আছেন তারা। এসব পরিবারের পানি খাওয়ার একটা পাত্র পর্যন্ত নেই। স্বজনদের পাঠানো খাবার খেয়ে তারা বেঁচে আছেন। ক্ষেত খামার চাষ বাস সব বন্ধ। নষ্ট হচ্ছে ক্ষেতের ফসল। শিশুদের বই খাতা নেই, স্কুলে যাওয়া বন্ধ। গবাদি পশুগুলো রয়েছে অভুক্ত। মকবুল সর্দারের স্ত্রী রুকি বেগম (৬৫) বলেন, ‘যুদ্ধের বছরেও এমন সর্বনাশ হতি দেহি নেই।’

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বালিদিয়ার ইউপি চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান মিনা ও একই গ্রামের আ.লীগ নেতা ইউনুস সিকদারের সমর্থকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। সোমবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে নাসির মোল্যা ও মহর মোল্যার মধ্যে একটি বিরোধপূর্ণ জমি চাষ নিয়ে উভয় পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে ঝগড়া বেধে যায়। এক পর্যায়ে দেশি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে একে অপরের উপর হামলা চালায়।

সংঘর্ষ চলাকালে ২০টি বসতঘর ও ৪টি ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাট চালায় প্রতিপক্ষের লোকজন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে টিয়ার গ্যাস শেল ও ৮০ রাউ- গুলি ছোড়ে পুলিশ।

এই ঘটনার জের ধরে সোমবার সন্ধ্যায় মফিজুর রহমান মিনা গ্রুপের আহম্মদ শিকদারের ছেলে জসিম (১১) বালিদিয়া হাটে বাজার করতে গেলে ইউনুস গ্রুপের মন্নু সিকদার তাকে গরম লোহার রড দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় স্যাঁকা দেয়। তাকে আহত অবস্থায় মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

এই খবর ছড়িয়ে পড়লে উভয় গ্রুপের সমর্থকেরা দেশি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রাতে পুনরায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ চলাকালে কাঞ্চন মোল্যার ২টি, আকুব্বর মোল্যার ২টি, হাফিজার মোল্যার ৩টি বসত ঘর, কামাল মোল্যার ১টি রাইস মিল ১টি দোকান, জিল্লু সর্দার, পান্নু সর্দার, মন্নু সর্দার, আমিরুল সর্দার, সামাদ মোল্যা ও আলম মোল্যার দোকান ঘর আগুনে সম্পূর্ণ ভষ্মীভূত হয়েছে। সংঘর্ষে চলাকালে অন্তত ১৫টি বসতবাড়ি ও দোকানে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়।
আগুনে জিল্লু সর্দার, নবীর মোল্যা ও কাঞ্চন মোল্যার পাটকাঠির গাঁদা পুড়ে যায়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা আগুন জ্বলার পর মাগুরা থেকে দমকল কর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনেন।

প্রতিবন্ধী কামালের স্ত্রী আহাজারি করতে করতে বলেন, ‘স্বামী অচল। রাইসমিল ও দোকান করে কোনমতে সংসার চালাতাম। চোখের সামনে আগুন দিলো। সব ছাই হয়ে গেল।’

কামাল মোল্যা বলেন, ‘সব বিক্রি করে বাড়ির সঙ্গে একটা দোকান করেছিলাম। গত রাতে আমার সব শেষ হয়ে গেছে।’

মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বালিদিয়া গ্রামে পুরুষ লোকজন তেমন নেই। হামলা-মামলার ভয়ে অধিকাংশই বাড়ি ছাড়া। বৃদ্ধ নারী ও শিশুরা বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছেন। তাদের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ। কয়েকজনকে দেখা গেছে পুড়ে যাওয়া ভিটায় আবার বাঁশ, পোড়া টিন ও পলিথিন দিয়ে রাত্রি যাপনের জন্য মাথার উপর একটি ছাউনি দাড় করানোর চেষ্টা করছেন। প্রতিপক্ষের লোকজন এ ঘটনার বদলা নিতে যে কোন সময় আবার হামলা চালাবে এমন গুজব সর্বত্র। অনেকে বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে মূল্যবান মালপত্র, গৃহস্থালী সামগ্রী ও গবাদি পশু সরিয়ে নিয়েছেন।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বিবাদমান দুটি পক্ষই ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক হওয়ায় পুলিশ পড়েছে বেকায়দায়। তারা কারো বিরুদ্ধেই শক্ত অবস্থান নিতে পারছে না। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মামলা বা কেউ আটক হয়নি। এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা রয়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

মহম্মদপুর থানার ওসি মতিয়ার রহমান বলেন, ‘আমরা দুই পক্ষকে নিবৃত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

জেআই