জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস আজ। অন্যান্য দেশের মতো ‘আদিবাসী ভাষা চর্চা ও সংরক্ষণে এগিয়ে আসুন’ এই প্রতিপাদ্যে নিয়ে বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করছে সাংবিধানিকভাবে ‘উপজাতি, নৃ-গোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা সম্প্রদায়’ হিসেবে পরিচিত আদিবাসীরা।
১৯৯২ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ উপকমিশনের কর্মকর্তারা তাদের প্রথম সভায় আদিবাসী দিবস পালনের জন্য ৯ আগস্টকে বেছে নেয়। এরপরে ৯৩ সালকে ‘আদিবাসী বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
পরের বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রতিবছর ৯ আগস্টকে ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১৯৯৫-২০০৪ এবং ২০০৫-১৪ সালকে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় আদিবাসী দশক ঘোষণা করা হয়। ২০০১ সালে ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম’ গঠনের পর থেকে বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে বড় পরিসরে দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে।
বিশ্বের ৭০টি দেশে প্রায় ৩০ কোটি আদিবাসী বাস করে। বাংলাদেশে রয়েছে প্রায় ৩০ লাখ আদিবাসী।
কিন্তু সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীতে তাদেরকে ‘উপজাতি, নৃ-গোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা সম্প্রদায়’ হিসেবে অভিহিত করেছে বর্তমান সরকার। তাই ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি থেকে সরে যায়নি দেশের ৪৫টি সংখ্যালঘু এই জাতিসত্তা প্রায় ৩০ লাখ আদিবাসীরা।
সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিয়ে বিপরীতমুখী অবস্থানে সরকার ও আদিবাসী নেতৃবৃন্দ। সরকারী ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন আদিবাসী নেতৃবৃন্দ।
আর রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালন করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠনসহ (বাগাছাস) বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
এ বছরের আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘আদিবাসী ভাষা চর্চা ও সংরক্ষণে এগিয়ে আসুন’ এর সঙ্গে সংহতি জানিয়ে নেতারা বলেন, প্রতিটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। নিজের ভাষা, সংস্কৃতি চর্চার স্বাধীনতা রয়েছে। প্রতিটি জাতিকে তার নিজস্ব ভাষায় শিক্ষার সুযোগ করে দিতে হবে। ভাষা ও বর্ণমালা রক্ষা এবং তাদের ভাষায় শিক্ষা জীবন শুরুর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি জাতির মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রকাশে উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান তারা।
নেতারা এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের আদিবাসীরা এদেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল জাতিগত শোষণের সমাপ্তি ঘটানো। কিন্তু দেশে পাহাড় ও সমতলের ছোট জাতিসত্তাসমূহের ওপর নানা ধরনের নিপীড়ন আজও চলছে, যা মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের বিচ্যুতি।
নেতারা আদিবাসীদের উন্নয়নের জন্য তাদের নিজস্ব গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত, প্রশাসনিক ও অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
বাংলাদেশে আদিবাসী কারা- এই বিতর্কটি খুব প্রাচীন নয়, বড়ো জোর এক দশকের। ইস্যুটি পুরাতন না হলেও তা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাস, অখ-তা ও সার্বভৌমত্বকে নাড়া দিয়েছে। জাতীয় সংহতির প্রশ্নে তাই এ বিতর্কের আশু সমাধান জরুরি।
২০১৪ সালের ৭ আগস্ট জারি করা সরকারি এক তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী বর্তমানে দেশে আদিবাসীদের কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও বিভিন্ন সময় বিশেষ করে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে ‘আদিবাসী’ শব্দটি বারবার ব্যবহার হয়ে থাকে।
পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে উল্লেখ করে তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, “আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আলোচনা ও টকশোতে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে এবং সকল আলোচনা ও টকশোতে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ সুশীল সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিবর্গকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আদিবাসী শব্দটির ব্যবহার পরিহারের জন্য পূর্বেই সচেতন থাকতে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।”
এ বিষয়ে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) জানান, সংবিধানে আদিবাসীদের উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আদিবাসী জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
এদিকে, বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আজ শুক্রবার সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন (বাগছাস) এর উদ্যেগে অনুষ্ঠিত হবে সমাবেশ, র্যালি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে সভাপতিত্ব করবেন বাগাছাসের সভাপতি লিংকন দিব্রা।
জেড





