বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশেই কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগ ও দপ্তরের পরিস্কার ধারণা নেই। গবেষণায় এমন তথ্য উঠে আসার কথা জানিয়েছে টিআইবি। এ বিষয়ে সরকারি অংশীজনের তুলনায় বেসরকারি অংশীজনরা অনেক বেশি ধারণা রাখে বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

সোমবার সকালে টিআইবি’র ধানমন্ডি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট (এসিডি) এর পরিচালক ও গবেষক ড. এ.কে. এনামুল হক।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা, নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের ও জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসন ইউনিটের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার এম. জাকির হোসেন খান।

“জলবায়ু পরিবর্তন উপশম (mitigation) বিষয়ে স্বপ্রণোদিত অঙ্গীকার ও প্রতিপালন: দক্ষিণ এশীয় অভিজ্ঞতাভিত্তিক পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণ” শীর্ষক এ গবেষণাটি পরিচালনা করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ।

মূলত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কার্বন হ্রাস সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি পালনে কতটা সচেষ্ট,প্রতিশ্রুতি গুলো সর্বোৎকৃষ্ট কি-না এবং সরকারগুলোর এ বিষয়ক কার্যক্রমকে নাগরিক বা জনগণ কিভাবে মূল্যায়ন করছে তা জানার উদ্দেশ্যেই গবেষণাটি পরিচালিত হয়।

দক্ষিণ এশীয় সরকারগুলোর সব প্রতিশ্রুতি বিবেচনায় নিয়ে এ গবেষণায় দুই ধরনের অংশীজন- সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও গবেষক এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দের প্রশ্নমালা সরবরাহ করে তাদের মতামত গ্রহণ করা হয়।

১৭ নভেম্বর ২০১৬ থেকে ৩০ এপ্রিল ২০১৭ সময়ে গবেষণার তথ্য সংগৃহীত হয়। বাংলাদেশে ৬৪ জন, নেপালে ৮০ জন, মালদ্বীপে ৬১ জন, ভারতে ৫৮ জন, শ্রীলংকার ৬৩ জন ও পাকিস্তানের ৫০ জনকে প্রশ্নমালা ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠানো হয়। গবেষণা প্রতিবেদনটি মোট ১৪০ জনের কাছ থেকে প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত।

গবেষণায় দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার সরকারি ও গবেষক গোষ্ঠী জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি বা পদক্ষেপ বিষয়ে এনজিও ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর তুলনায় অনেক বেশি ধারণা রাখেন। বাংলাদেশে নৌপথ কিংবা রেলপথ ব্যবহার করে যে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো যায় সে বিষয়ে বেসরকারি অংশীজন অনেক কম ধারণা রাখেন। একই ভাবে অফিস কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বৈদ্যুতিক পাখা পরিবর্তন করেও যে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো যায় সে বিষয়ে তাদের ধারণা স্পষ্ট নয়।

গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর জন্য বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ বিষয়ে দেখা যায়, অন্যতম প্রধান ৬টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে ইটের ভাটায় জ্বালানি পরিবর্তন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে যে কার্বন নিঃসরণ কমানো যায় সে বিষয়ে ধারণা সকলেরই অত্যন্ত কম। তবে সরকারের অন্যান্য পদক্ষেপ- যেমন বাসার ছাদে ও বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, সৌরচালিত পানির পাম্প ও বর্জ্য হতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বিষয়ে সকল অংশীজনই কমবেশি অবহিত।

গবেষণার সকল উত্তরদাতার মতে, কার্বন নিঃসরণ কমানোর সহজ ১০টি প্রধান কৌশল হলো: নগরে যানজট কমানো, নগর পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, নগরে যান নিয়ন্ত্রণ কৌশল উন্নয়ন, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, ইটের ভাটায় জ্বালানি পরিবর্তন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের আধুনিকায়ন, শহরে বর্জ্য হতে জৈব সার উৎপাদন, বাজারে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রের প্রমিতকরণ, গ্রামাঞ্চলে উন্নত চুলার ব্যবহার বাড়ানো এবং কারখানায় জ্বালানি অডিট ব্যবস্থা প্রবর্তন।

বাংলাদেশের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিতে ২০৩০ সাল নাগাদ স্বাভাবিকের তুলনায় ৫ শতাংশ কম কার্বন নিঃসরণ এবং বিদেশি সহায়তা পেলে আরো ১৫ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করার কথা বলা হয়। এছাড়াও বিদ্যুৎ, যানবাহন ও শিল্পখাতের কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণেরও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, কার্বন নিঃসরণ কমাতে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত ১১টি পদক্ষেপের মধ্যে ৯টির পক্ষে ৭০ শতাংশ বা তার অধিক উত্তরদাতা মত দিয়েছে। তবে অপর দু’টি পদক্ষেপ- যন্ত্রের প্রতিমকরণ এবং পরিবেশ অডিটের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানো যাবে ধারণার সাথে অধিকাংশ উত্তরদাতা একমত নন।

গবেষণাটি পরিচালনা করেন বাংলাদেশের এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট (এসিডি) এর পরিচালক ড. এ.কে. এনামুল হক ও ফেলো শেমান বিদ্যানাগ, ভারতের গোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. প্রণব মুখোপাধ্যায়, নেপালের সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর এনভায়রনমেন্ট ইকোনমিকস এর গবেষণা প্রোগ্রাম ম্যানেজার ড. মানি নেপাল, মালদ্বীপের ফ্রিল্যান্স অর্থনীতিবিদ ফাতিমাত শফিকা এবং পাকিস্তানের করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. হেমান লোহানো দাস।