এক পথ রুদ্ধ হচ্ছে তো ভিন্ন পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন রোহিঙ্গারা। অর্থ ও নৌ-যান সংকটে নৌকায় যখন নাফ নদ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকা যাচ্ছেনা ঠিক তখনই নতুন কৌশলে বাংলাদেশ আসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন রোহিঙ্গারা। গত সাত দফায় বুকে জারিকেন নিয়ে নাফ নদ সাঁতরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছিল ৬১ রোহিঙ্গা। এ উপায়ে নারী ও শিশুদের নিয়ে আসা কঠিন ও বিপদসংকুল হওয়ায় এবার তারা অন্য উপায়ে আসতে শুরু করেছে। জারিকেনের উপর বাঁশ ও কাঠ বসিয়ে তৈরী ভেলা’য় ভেসে নাফ নদ পাড়ি দিয়ে এপারে আসছেন নারী শিশুসহ রোহিঙ্গারা।
বৃহস্পতিবার (১০ নভেম্বর) ভেলায় ভেসে নাফ নদ পাড়ি দিয়ে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে ঢুকেছে ১৩২ রোহিঙ্গা। দুই ভেলায় চড়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৬১ জন শিশু, ৪০ জন নারী ও ৩১ জন পুরুষ ছিল।
এর আগে গত বুধবার সকালে প্রথম দফায় ভেলায় ভেসে শাহপরীর দ্বীপ ঢুকেছিল ৫২ রোহিঙ্গা। এ নিয়ে গত দুই দিনে ভেলায় ভেসে তিন দফায় বাংলাদেশে ঢুকেছে ১৮৪ রোহিঙ্গা।
জানা যায়, গতকাল সকাল ১০ টায় রোহিঙ্গাদের প্রথম ভেলাটি শাহপরীর দ্বীপ জেটি সংলগ্ন বিজিবি ক্যাম্পের সামনে পৌঁছে। এতে নারী শিশুসহ ৬০ জন রোহিঙ্গা ছিল। এর আধা ঘন্টা পর রোহিঙ্গাদের দ্বিতীয় ভেলাটি শাহপরীর দ্বীপ দক্ষিণ জালিয়া পাড়া পয়েন্টে পৌঁছে। এতে নারী শিশুসহ ৭২ জন রোহিঙ্গা ছিল ।
ভেলায় চড়ে আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, তারা সবাই রাখাইনের বুসিডং, রাসিডং ও সিন্দিপ্রাং এলাকার বাসিন্দা। রাখাইনে সেনাদের চাপের মুখে ঘরে বন্দী জীবনে অতিষ্ট হয়ে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার উদ্দেশ্যে কেউ এক সপ্তাহ আগে আবার কেউ দু’তিন সপ্তাহ আগেই ঘর ছেড়ে দক্ষিণ রাখাইনের ধাওনখালী চরে এসে অবস্থান করেছিলেন। কিন্তু সেখানে এসে বাংলাদেশ ঢুকতে কোন নৌকা না পাওয়ায় তারা হতাশ হয়ে কয়েক দফায় তাদের মধ্যে কিছু যুবক জারিকেন বুকে নাফ নদ সাঁতরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছিলেন। কিন্তু খাদ্য ও চিকিৎসা সংকটে দুর্বিষহ দিন কাটছিল নারী ও শিশুদের। তাই তারা রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের এপারে পৌঁছাতেই প্লাস্টিক জারিকেনের উপর বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরী করেছিল ভেলা। সেই ভেলায় ভেসে তারা এখন নিরাপদ জীবনের খোঁজে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন।
তারা আরো জানান, ধাওনখালী চরে আরো অন্তত ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। সেখানে তারা চরম অনিশ্চিয়তার মধ্যে মানবেতর দিন পার করছেন। তাদের অনেকের খাদ্য শেষ হয়ে যাওয়ায় অনাহারে অর্ধাহারে বাংলাদেশে ঢুকতে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। তবে এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশ না পৌঁছতে পারলে তাদের সেদেশের সেনা ও মগদের হাতে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
ভেলায় চড়ে আসা রাসিডং এলাকার রোহিঙ্গা নুর হোসেন বলেন, ‘রাখাইনে আমাদের খুব দুর্বিষহ দিন কাটছিল। সেখানকার সেনা ও মগদের চাপের মুখে ঘরে বন্দী জীবনে অতিষ্ট হয়ে পালিয়ে বাংলাদেশ আসতে ১৭ দিন আগেই ঘর ছেড়ে রাখাইনের ধাওনখালী চরে এসে অবস্থান নেই। কিন্তু সেখানে এসে বাংলাদেশ ঢুকতে নৌকা না পেয়ে আমরা হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম।’
তিনি আরো বলেন, ‘নৌকা সংকটে এর আগেও আমাদের মধ্যে থেকে ৬১ যুবক জারিকেন বুকে নাফ নদ সাঁতরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছিল। কিন্তু সে উপায়ে আমাদের সন্তান ও নারীদের এপারে নিয়ে আসা অসম্ভব হয়ে যাওয়ায় তাদের এপারে পৌঁছাতে প্লাস্টিক জারিকেনে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে ভেলা তৈরী করে নিয়েছিলাম। সেই ভেলায় ওঠে আমরা নাফ নদ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছি। এখানে পৌছে আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি।’
রোহিঙ্গা নারী হাসিনা খাতুন বলেন, ‘ রাখাইনে সেনা ও মগদের কারণে কেউ কিছুই করতে পারছেনা। আমাদের যা ছিল সব হারিয়েছি। ওরা আমাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। তাই বাংলাদেশে ঢুকতে দুই সপ্তাহ আগে ধাওনখালী চরে এসেছিলাম। কিন্ত আামদের হাতে কোন টাকা পয়সা না থাকায় অতিরিক্ত ভাড়ায় নৌকায় আসা হয়নি। গ্রামের পুরুষদের হাতে পায়ে ধরে কোনমতে তাদের ভেলায় (ভ্যুর) চেপে চলে এলাম।’
আরেক রোহিঙ্গা যুবক আবু বকর বলেন, ‘মিয়ানমার সেনারা আমাদের ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছেনা। ক্ষেতের ধান কাটতে বাঁধা দিচ্ছে। এছাড়া তারা আমাদের বাজারে যাওয়া ও স্বাভাবিক চলাচলেও বাঁধা দিচ্ছে। আমাদের মধ্যে থেকে অনেক যুবক ভাইদের কাজের বাহানায় ডেকে নিয়ে হত্যা করেছে, আমরা আমাদের ভাইদের আর খোঁজ পায়নি। আমরা সেখানে থাকলে আমাদেরও একই পরিণতি হত। তাই অসহায় ও নিরুপায় হয়ে আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছি।’
ভেলায় চেপে নাফ নদ পাড়ি দেয়া রোহিঙ্গা নারী আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘অন্য সবার চেয়ে আমাদের মতো অসুস্থ নারী ও শিশুদের খুব কষ্ট হচ্ছে সেখানে। সেনা ও মগরা আমাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দিচ্ছিল। যুবকরা ভয়ে আগেই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল। ওখানে আমাদের বসবাস করা খুব কঠিন ছিল। তাই সেনা ও মগদের অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে ১২ দিন ধাওনখালী চরে অপেক্ষার পর অবশেষে ভেলায় ওঠে বাংলাদেশে এসেছি।’
এর আগে গত বুধবার রাতেও টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, হারিয়াখালী সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে নৌকায় অতিরিক্ত ভাড়া শোধ করে ঢুকেছিল সাড়ে ৭’শ রোহিঙ্গা। তাদের বিজিবি হেফাজতে রাখার পর হারিয়াখালী সেনা ত্রাণ বিতরণ ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হয় বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্ত প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে রাখাইন থেকে এপারে পালিয়ে আসতে সহসা কোন নৌকা পাচ্ছেনা রোহিঙ্গারা। তবে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতেই ইতোমধ্যে ঘর ছেড়ে নাইক্ষ্যংদিয়া ও ঢংখালী সীমান্তে জড়ো হয়ে মানবেতর দিন কাটছে প্রায় বিশ হাজার রোহিঙ্গার। এদের মধ্যে সবচেয়ে করুন ও দুর্বিষহ দিন কাটছে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের।
এদিকে নৌকা না পেয়ে গত ১১ অক্টোবর থেকে ৭ দফায় নাফ নদ সাঁতরিয়ে বাংলাদেশে এসেছিল ৬১ রোহিঙ্গা। ঝুঁকির সেই যাত্রায় নারী ও শিশুরা বাদ পড়াতেই এবার নতুন কৌশলে ভেলা বানিয়ে নারী ও শিশু সহ নাফ নদ পাড়ির উদ্যেগ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন রোহিঙ্গারা।
কেবি





