দেশজুড়ে বীর শহীদদের সশ্রদ্ধ স্মরণের মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার মহান স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপিত হয়েছে। দিবসটিতে জাতি মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মরণসহ ফুল দিয়ে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

১৯৭১ সালে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বিশ্বমানচিত্রে জায়গা করে নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে সেই বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খানের নেতৃত্বে বিএনপি ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। পরে সর্বস্তরের জনতা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ফুলে-ফুলে ভরে যায় সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি এবং টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধি প্রাঙ্গণ।

বৃহস্পতিবার প্রত্যুষে তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দর এলাকায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানমালার সূচনা হয়। ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে বীর শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর তারা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। সশস্ত্র বাহিনীর একটি সুসজ্জিত চৌকস দল এ সময় গার্ড অব অনার প্রদান করেন। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর।

এ সময় স্পিকার, মন্ত্রিবর্গ, উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, মুক্তিযোদ্ধারা, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকগণ, উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে সংগঠনের পক্ষে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

এ ছাড়া, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে রাখা পরিদর্শক বইতে স্বাক্ষর করেন।

এ দিকে, সকাল ৭টা ১ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জাতীয় শিশু-কিশোর সমাবেশে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, ঢাকার জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন মিয়া প্রমুখ।

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার ছিল সরকারি ছুটি। স্বাধীনতা দিবসের তাত্পর্য তুলে ধরে বেতার, টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হয়। সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ভবন, বাড়িঘর, যানবাহন ও দোকানে ওড়ানো হয় জাতীয় পতাকা। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোতে আলোকসজ্জা করা হয়। দেশজুড়ে মসজিদে বিশেষ মোনাজাতে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত, দেশের শান্তি ও অগ্রগতি কামনা করা হয়। মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাতেও বিশেষ প্রার্থনার ব্যবস্থা করা হয়।

বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন-প্রতিষ্ঠান আনন্দ শোভাযাত্রা, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ নানা আয়োজনে মহান স্বাধীনতা দিবস পালন করে।

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন ও মোনাজাত করা হয়। অজসস্র মানুষের শ্রদ্ধাঞ্জলির ফুলে ভরে উঠে স্বাধীনতার মহান স্থপতির সমাধিস্থল।

সশস্ত্র বাহিনীও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করে। উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্র, হাসপাতাল, জেলখানা, সরকারি শিশুসনদসহ অনুরূপ প্রতিষ্ঠানসমূহে।

সাভারে লাখো মানুষের ঢল:

ভোর থেকেই মানুষের ঢল নামে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে। হাতে-হাতে ছিল রং-বেরঙের ফুল আর লাল-সবুজের পতাকা। ফুলে-ফুলে ভরেওঠে স্মৃতিসৌধের বেদীমূল। স্মৃতিসৌধ ঘিরে গোটা সাভার-নবীনগর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে উত্সবের আমেজ।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের পর বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রী পরিষদের সদস্যগণ এবং কূটনীতিকরা স্মৃতিসৌধ এলাকা ত্যাগ করার পর স্মৃতিসৌধ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

স্মৃতিসৌধে যাননি খালেদা জিয়া:

বিএনপির পক্ষ থেকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খানের নেতৃত্বে সকাল সোয়া ৮টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধের শহীদবেদিতে ফুল দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান, খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা এনামুল ইসলাম, বিএনপির নেতা আলতাফ হোসেন চৌধুরী, ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নানসহ নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান বলেন, ‘খালেদা জিয়া অবরুদ্ধ তাই তিনি শ্রদ্ধা জানাতে আসেননি।’

জাতীয় পার্টির (জেপি) শ্রদ্ধাঞ্জলি:

সকাল সাড়ে ৬টায় জাতীয় পার্টির (জেপি) কেন্দ্রীয় ও দেশের সকল দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সকাল সাড়ে ৮টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে দলের পক্ষ থেকে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। এ সময় জেপি নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন—দলের মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম, প্রেসিডিয়াম সদস্য এজাজ আহমেদ মুক্তা, ভাইস চেয়ারম্যান শরীপ শফিকুল হামিদ চন্দন, যুগ্ম মহাসচিব খলিলুর রহমান খলিল, খন্দকার শাহীন আলদ্বীন রিজভি, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল খায়ের সিদ্দিকী আবু, দপ্তর সম্পাদক এম সালাহ উদ্দিন আহমেদ, প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম তপন, প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক কে এম মজিবুর রহমান মজনু, শিক্ষা ও ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনামুল ইসলাম রাসেল, যুগ্ম দপ্তর সম্পাদক জীবন কৃষ্ণ বৈরাগী, নরসিংদী জেলার সভাপতি সাদেকুর রহমান, যুব সংহতির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মঞ্জুর হাবিব, মানিকগঞ্জ জেলা জেপি নেতা দুলাল পাল প্রমুখ।

বিশিষ্ট ব্যক্তি  সংগঠনের শ্রদ্ধা:

সকালে ঢাবি উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের নেতৃত্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, গণফোরাম, এলডিপি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, সেক্টর্স কমান্ডারস ফোরাম, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), জাসদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), বাসদ, সাম্যবাদী দল, গণতন্ত্রী পার্টি, মহিলা পরিষদ, কৃষক লীগ, কৃষক সমিতি, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, যুবলীগ, যুব ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, জাসাস, ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, বঙ্গবন্ধু সংসদসহ বিভিন্ন দল, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।

এ ছাড়া, স্মৃতিসৌধের বেদীতে ফুল দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুত্-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জনতা ব্যাংক, এডাব, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র কমান্ড, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় শ্রমিক লীগ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা:

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল মানুষের ঢল। অগণিত মানুষ শ্রদ্ধা জানান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। দেশাত্মবোধক গান, স্লোগান আর মিছিলে মিছিলে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন প্রাঙ্গণ দিনভর ছিল মুখরিত। হাজার হাজার মানুষ বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে-ঘুরে দেখেন।

জাতীয় স্মৃতিসৌধের কর্মসূচি শেষ করে প্রধানমন্ত্রী ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে প্রধানমন্ত্রী দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দলীয় সভানেত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।

এ সময়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও অ্যাডভোকেট ইউসূফ হোসেন হুমায়ুন, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন ও সতীশ চন্দ্র রায়, নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, আইন-বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এরপর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জাতীয় সংসদরে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বঙ্গবন্ধু ভবন এলাকা ত্যাগ করার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতা-কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ সারিবদ্ধভাবে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

জেআই