কুষ্টিয়ায় সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশায় দুর্ঘটনা যেন এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না করায় জেলার অধিকাংশ সড়ক-মহাসড়ক এখন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে।

কার্পেটিং উঠে গিয়ে এসব সড়কের বিভিন্ন স্থানে স্থানে তৈরী হয়েছে ছোট-বড় খানাখন্দ। যার ফলে সড়কগুলোতে ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছে যানবাহন। বেহাল সড়ক-মহাসড়কের কারণে প্রতিনিয়তই ঘটছে দূর্ঘটনা।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর-ভেড়ামারা সড়ক: দীর্ঘ ১৪ বছরেও দৌলতপুর-ভেড়ামারা সড়কের সংস্কার না হওয়ায় জনদূর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানা বাজার থেকে ভেড়ামারা সাতবাড়িয়া পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিঃ মিঃ দীর্ঘ সড়কটির বেহাল দশার কারনে চলাচলের একবারেই অযোগ্য হয়ে পড়েছে। দৌলতপুরের মানুষের চলাচলের একমাত্র সড়কটি যোগাযোগের মাধ্যম হওয়ায় জনদূর্ভোগ বেড়েই চলেছে।

দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে সংস্কার বা পুনঃনির্মান কাজ না হওয়ায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে জনগুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটি। জীবন হাতে নিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ এ সড়কে যাতায়াত করছে। ফলে একদিকে যেমন দীর্ঘ সময় ব্যয় হচ্ছে অন্যদিকে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা আর প্রাণহানি।

অতি দ্রুত জনবহুল এ সড়কটি সংস্কার ও মেরামত করে যানবাহন চলাচলের উপযোগী করে সীমাহীন জনদূর্ভোগ লাঘবের জোর দাবী জানিয়েছে ভূক্তভোগী এলাকাবাসী।

জানা যায়, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় বিপুল অর্থ ব্যয় করে সড়ক ও জনপথ (সওজ) এর আওতায় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানা বাজার থেকে ভেড়ামারা ১২ মাইল পর্যন্ত প্রায় ২১ কিলোমিটার সড়ক পুনঃনির্মাণ করা হয়। কিন্তু অতি নিম্নমানের কাজের কারনে নির্মাণের পরের বছরই আবার তা খানা-খন্দকে ভরে সড়কটি হয়ে পড়ে জরাজীর্ন।

তারপর কয়েকটি সরকারের পরিবর্তন হয়েছে। সেই সাথে ওই সকল সরকারের জনপ্রতিনিধিদেরও ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে। শুধু পরিবর্তন হয়নি জীর্ন এই সড়কটির ভাগ্যের। খানা খন্দকে ভরা জীর্ন দশা নিয়ে কালের স্বাক্ষী হয়ে দন্ডায়মান রয়েছে আজও এই সড়কটি।

ভাংগাচোরা ও গর্তে ভরা সড়কে চলাচল করতে গিয়ে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা, ঘটছে প্রাণহানি। এই সড়ক দিয়েই দৌলতপুর উপজেলা পরিষদ, হাসপাতাল, থানা ও প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে যেতে হয় সকলকে। কিন্তু জরাজীর্ণ এই সড়ক দিয়ে ওইসব জরুরী দপ্তর বা হাসপাতালে যেতে সময় লাগে দ্বিগুনেরও বেশী যা অসুস্থ রোগী আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে। আবার অনেক সময় রোগী মারাও যায়।

যানবাহন চালকরা জানান, এ সড়কে গাড়ী চালিয়ে তাদের আয়ের থেকে ব্যয়ই বেশী হয়। কারন, খানাখন্দকে ভরা সড়কে চলতে গিয়ে গাড়ীর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ভেংগে যায়।

আবার গন্তব্যে পৌঁছতে যাত্রীদের প্রয়োজনের চেয়ে দুই তিন গুন সময় ব্যয় করতে হয়। আবার যানবহনের গতি পরিবর্তন করতে গিয়ে উল্টে খাদেও পড়তে হরহামেশাই।

সড়কে চলাচলকারী যাত্রীরা জানান, আগে এই সড়কে যেতে সময় লাগতো মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট, আর এখন সেখানে লাগছে প্রায় এক ঘন্টা। দীর্ঘদিন ধরে রাস্তটির বেহাল দশা হলেও কর্তৃপক্ষের কোন মাথাব্যাথা নেই।

অন্যদিকে সড়কের দুপাশে বসবাসকারী মানুষের ভোগান্তিরও অন্তনেই। বর্ষায় কাদা আর গ্রীষ্মে রাস্তার ধুলায় তারা নানা বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। বিশেষ করে শুকনো সময়ে ভারি যানবাহন গেলে রাস্তার দুপাশ ধুলায় অন্ধকার হয়ে যায়। যার কারনে তাদের শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে হচ্ছে।

তারাগুনিয়া মন্ডলপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সানাউল হক সেন্টু জানান, রোগীদের হাসপাতালসহ জরুরী সেবা নিতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। চলাচলের অযোগ্য এই রাস্তায় সুস্থ মানুষের চলা দায়। এমনকি সন্তান সম্ভাবা প্রসূতিকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পথে সন্তান প্রসব হতে দেখা গেছে।

দৌলতপুরের আব্দুল কাদের জানান,এই সড়কের মা বাবা নাই, যদি থাকতো তাহলে দীর্ঘ ১৪ বছরে এই সড়কটি সংস্কার বা মেরামত করা হতো। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জিয়াউল হায়দার জানান, ইতিমধ্যে সড়কটি জেলা সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের অন্তভূক্ত হয়েছে।

সে অনুযায়ী অর্থও বরাদ্দ হয়েছে। টেন্ডারসহ অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বর্ষার শেষে কাজ শুরু করা যাবে বলে তিনি জানান।

কুষ্টিয়ার মিরপুর জিয়া সড়ক: কুষ্টিয়ার মিরপুর পৌর এলাকায় জনসাধারনের চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নাম ‘জিয়া সড়ক’।

মিরপুর বাজার থেকে কুষ্টিয়া-মেহেরপুর সড়কের চৌরাস্তা পর্যন্ত মাত্র ১কিলোমিটার সড়কটির বিভিন্নস্থানে কার্পেটিং ও খোয়া উঠে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। পাঁচ বছরের অধিক সময় ধরে সংস্কার না হাওয়ায় সড়কটি জনসাধারনের চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

এদিকে সড়কটির নিকটবর্তী কোন বিকল্প সড়ক না থাকায় জনসাধারন জীবনের ঝুঁকি নিযে সড়কটি ব্যবহার করছে। সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন শতশত যানবাহন চলাচল করে থাকে।

শুকনো মৌসুমে রাস্তাটির গর্তগুলো দেখে যানবাহনের চালকরা ঝুঁকি নিয়ে কোনমতে চলাচল করলেও বর্ষা মৌসুমে সড়কটির বিভিন্নস্থানে সৃষ্টি হওয়া বড় বড় গর্তে জমে থাকা পানি যানবাহন চালকদের কাছে আতঙ্কের কারন হয়ে ওঠেছে।

কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়ক: মাত্র দেড় মাস আগে শেষ হয় কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের প্রায় ২৪ কিলোমিটারের সংস্কারকাজ।

গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ওই সড়কের পাথর উঠে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের প্রায় ২৪ কিলোমিটারের সংস্কারকাজ দেড় মাস আগে শেষ হয়। কিন্তু গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে সড়কের পাথর উঠে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।

কুষ্টিয়া সড়ক ও জনপথ (সওজ) কার্যালয় সূত্র জানায়, কুষ্টিয়া শহরের মজমপুর রেলগেট থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত মহাসড়কের প্রায় ২৪ কিলোমিটার অংশ বড় ও ছোট পাথর দিয়ে কার্পেটিং করার জন্য গত বছর দরপত্র আহ্বান করা হয়।

এ জন্য ব্যয় ধরা হয় প্রায় সাত কোটি আট লাখ টাকা। কাজের দায়িত্ব পায় সিলেটের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জামিল ইকবাল এন্টারপ্রাইজ।

চলতি বছরের ৩ মার্চ কাজ শুরু হয়। দরপত্র অনুযায়ী ২১ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে তড়িঘড়ি করে মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে কাজ শেষ করা হয়। এর মধ্যে ঠিকাদার প্রায় ছয় কোটি টাকা তুলে নেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সংস্কার করা সড়কের বিভিন্ন জায়গায় পাথর উঠে গিয়ে ছোট ছোট গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে যান চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।

শহরের মজমপুর, বিসিক এলাকা, চৌড়হাস, ভাদালিয়া, আলামপুর ও বৃত্তিপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, পাথর উঠে সড়কের পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। ছোট ছোট গর্তে পানি জমে আছে। ওই সড়কে চলাচলকারী ট্রাকের চালক শওকত আলী বলেন, মাত্র দেড় মাস আগে সড়কের কাজ হলো।

এখন দেখে বোঝার উপায় নেই যে সড়ক সংস্কার করা হয়েছে। শুধু শুধু টাকা অপচয় করা হয়েছে। বটতৈল এলাকার বাসিন্দা জহির উদ্দীন বলেন, কোনো রকম গোঁজামিল দিয়ে কাজ করে ঠিকাদার চলে গেছেন। কয়েক দিন পরই সড়ক আগের অবস্থায় ফিরে গেছে।

কুষ্টিয়ার একজন পরিবহন মালিক বলেন, সড়কটির সংস্কারের জন্য আমাদের অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে। অথচ কয়েক দিনের বৃষ্টিতেই সড়কটি আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। কুষ্টিয়া সওজের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী দেব দয়াল বলেন, গর্ত সংস্কারের জন্য কাজ করানোর কথা বলা হয়েছে।

সড়কের বেহাল অবস্থার কথা স্বীকার করে সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জিয়াউল হায়দার বলেন, ‘ওভার লে (বিদ্যমান সড়কের ওপর পাথর-বিটুমিনের আস্তরণ) না করলে কোনো সড়কই টেকানো সম্ভব না।

এই সংস্কারের শিডিউলে ওভার লের জন্য কোনো বরাদ্দ ছিল না।’ তিনি আরও বলেন, কার্যাদেশ অনুসারে ঠিকাদার এক বছর ওই সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ করবেন।

এসএইচ