সমস্যা যান্ত্রিক, কারিগরি। বিপর্যয় মানবিক। শুরু হয় দিনের আলোতে, নাগরিক ভোগান্তি দিয়ে। সন্ধ্যার পর তা শঙ্কা, আতঙ্কে রূপ নেয়। বিদ্যুৎ নেই কোথাও।
ঘরবাড়িতে প্রথম দুই ঘণ্টার মধ্যেই পানির সংকট দেখা দেয়। বিকেল নাগাদ হাঁড়ি বসানো নিয়েই শঙ্কা তৈরি হয়। শৌচকর্ম সম্পাদনের ভোগান্তি তো বলাই বাহুল্য। মুঠোফোনে চার্জ দিতে না পেরে অনেকের যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
অসুখ বলে-কয়ে আসে না। অনাকাঙ্ক্ষিত অসুস্থতার মধ্যে অনাহূত বিদ্যুৎ বিপর্যয় মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। দেশের সবচেয়ে বড় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পানি না থাকায় কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস মেশিন বন্ধ হয়ে যায়। পানির অভাবে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত রোগীর রান্না হয়নি। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ থাকে। সন্ধ্যার পর ওয়ার্ডগুলোতেও অন্ধকার নেমে আসে। পঙ্গু হাসপাতালে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত কোনো অপারেশন হয়নি। রংপুর মেডিকেলে অস্ত্রোপচার দূরে থাক, বন্ধ ছিল হৃদ্রোগে আক্রান্তদের অবস্থা পর্যবেক্ষণের মনিটরও। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে জেনারেটরের সাহায্যে শুধু আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা রাখা হয় দিনের বেলায়। হাসপাতালের শৌচাগারগুলোতে ময়লা উপচানো দুর্গন্ধ তো ছিলই। সরকারি হাসপাতালের যখন এই দশা, তখন বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর পরিস্থিতি তার চেয়ে আলাদা কিছু হওয়ার কথা নয়।
সাপ্তাহিক ছুটির কারণে ব্যাংকগুলো ছিল বন্ধ। কিন্তু শহুরে জীবনের লেনদেন আর কেনাকাটায় একটা ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে ডেবিট আর ক্রেডিট কার্ড। বিদ্যুৎ-বিপর্যয়ের পর টাকা তোলার মেশিনগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। বিপণিবিতানেও অচল হয়ে পড়ে ক্রেডিট কার্ড। কয়েকটি ব্যাংকের পক্ষ থেকে গ্রাহকদের এই সমস্যার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন যখন অর্থের, তখন সান্ত্বনায় কাজ হয় কতটুকু।
সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও পেট্রলপাম্পগুলো থেকে জ্বালানি সরবরাহও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। রাজধানীসহ বড় কয়েকটি শহরে জেনারেটরের সাহায্যে সীমিত আকারে জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। জ্বালানি না পেয়ে ঢাকায় কিছু যানবাহনকে টেনে টেনে গন্তব্যে নিয়ে যেতে দেখা গেছে।
জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ৫ নভেম্বর। প্রস্তুতি দূরে থাক, স্বাভাবিক জীবনই এর মধ্যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীদের। এই দুই পরীক্ষায় মোট প্রায় ২১ লাখ পরীক্ষার্থী অংশ নেওয়ার কথা।
দৈনন্দিন খাবারের একটা বড় অংশও ফ্রিজে রাখা হয়। ফলে বিপর্যয় সেখানেও।
বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর প্রথমে মানুষ মনে করে স্বাভাবিক লোডশেডিং। সময় বাড়ার সঙ্গে নানা মুখে গ্রিড লাইনে বিপর্যয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ায় দেখা দেয় উদ্বেগ। এলাকায় এলাকায় মাইকিংয়ের পর মানুষের মধ্যে অজানা উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। সন্ধ্যার পর মানুষ মোমবাতি কেনা শুরু করে। এর ফলে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে মোমবাতিরও সংকট দেখা দেয়। কল্যাণপুর এলাকার বাসিন্দা শাহানা সাত্তার জানান, সন্ধ্যার পর খোঁজ করেও আশপাশে মোমবাতি পাননি। পরে ছেলেকে ফোন করে মোম আনতে বললে রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করে মোমবাতি মেলেনি।
রাজধানীর কয়েকটি থানায় যোগাযোগ করে জানা যায়, পুলিশের বেতার যোগাযোগ (ওয়্যারলেস) চার্জের অভাবে একপর্যায়ে অকেজো হয়ে পড়ে। জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, ‘ক্রমান্বয়ে অনেক স্থানে বিদ্যুৎ আসছে। অচিরেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি। তবে এরই মধ্যে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’ বেতার যোগাযোগ অকেজো হওয়ার বিষয়ে আইজিপি বলেন, ‘আপৎকালীন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায় অনেক স্থানেই। বিকল্প ব্যবস্থায় যেগুলো চালু রাখা হয়, সেগুলোও দু-তিন ঘণ্টা চলে বন্ধ হয়ে যায়। জানতে চাইলে বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম বলেন, সারা দেশে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পোশাক কারখানা আছে। বিকল্প ব্যবস্থাও সীমিত। সবচেয়ে বড় সমস্যা ডায়িং কারখানায়। কারণ, জেনারেটর দিয়ে কাপড়ে ঠিকমতো রং করা যায় না।
মুঠোফোন কোম্পানিগুলোর টাওয়ার ব্যবস্থাপনাও নির্ভর করে বিদ্যুতের ওপর। টানা বিদ্যুৎহীনতা সেই নেটওয়ার্কও সমস্যায় ফেলে দেয়। ইন্টারনেটের গতিও কমে আসে। মুঠোফোন কোম্পানিগুলোর সংগঠন অ্যামটবের মহাসচিব নুরুল কবীর বলেন, নেটওয়ার্কবিষয়ক কারিগরি দল সকাল থেকেই মাঠে কাজ করছে। সব ধরনের বিকল্প ব্যবহার করে সমস্যা মোকাবিলার চেষ্টা চলছে। সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিপর্যয়ের আশঙ্কা আছে।
কয়েকটি সংবাদপত্র পরের দিনের পত্রিকা ছাপাতে পারবে কি না, সেই শঙ্কা দেখা দেয় রাতে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক মুশফিকুর রহমান বলেন, পানি না থাকায় ডায়ালাইসিস বন্ধ রাখতে হয়েছে। সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত রান্না করা যায়নি। সারা দিন জেনারেটরে অস্ত্রোপচার চলেছে। কিন্তু কতক্ষণ জেনারেটরে কাজ চালানো যাবে, সে নিয়ে শঙ্কা আছে।
দুই হাজার ৩০০ শয্যার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চার হাজার রোগী সেবা নেন। ২৪ ঘণ্টা অস্ত্রোপচার চলে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) সন্তানের জটিল সমস্যা নিয়ে এসেছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, ব্যাংকে টাকা জমা দিতে পারেননি বলে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করা হয়নি। হাসপাতালের পরিচালক আবদুল মজিদ ভূইয়া বলেন, শুধু যেখানে বিদ্যুৎ না দিলে রোগীদের জীবন বিপন্ন হতে পারে, সেখানেই জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে। সন্ধ্যার পর থেকে ওয়ার্ডগুলো অন্ধকার হয়ে যায়। নতুন স্থাপিত অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্সে ২৪টি অস্ত্রোপচার করার কথা থাকলেও নয়টি করা যায়।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, অবস্থা শোচনীয়। সারা দিন অস্ত্রোপচার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চললেও, বিকেলের পর থেকে জরুরি অস্ত্রোপচার করতে বেগ পেতে হচ্ছে।
ডান হাতের দুটি আঙুল কাটা পড়ে বেলা ১১টার দিকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে (পঙ্গু হাসপাতাল) আসেন নির্মাণশ্রমিক আশরাফুল। কর্তব্যরত চিকিৎসক সঙ্গে সঙ্গেই অস্ত্রোপচার কক্ষে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু আর অস্ত্রোপচার হয় না। অবশেষে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে জেনারেটর চালিয়ে তাঁর অস্ত্রোপচার শুরু হয়।
যোগাযোগ বিভাগের প্রধান সৈয়দ তালাত কামাল এক বিবৃতিতে বলেন, বিকল্প পদ্ধতিতে নেটওয়ার্ক স্বভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তার পরও দেশের কিছু কিছু এলাকায় মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলালিংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (মিডিয়া ও গণসংযোগ) শেহজাদ হোসেন রাতে বলেন, এখন পর্যন্ত নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে সমস্যার কোনো খবর নেই। বিকল্প পদ্ধতিতে নেটওয়ার্ক স্বাভাবিক রাখা হয়েছে।
রবির একজন মুখপাত্র জানান, তাঁদের ৫ শতাংশের কম নেটওয়ার্কে সমস্যা হয়েছে। এয়ারটেলের একজন বলেন, ভোগান্তি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।





