প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ সিলেটের পর্যটন খাত আরো সমৃদ্ধ হতে চলেছে। সেখানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় নির্মাণ হচ্ছে দেশের তৃতীয় চিড়িয়াখানা। নগরের টিলাগড় ইকোপার্কে ৮ একর জায়গার উপর এই মিনি চিড়িয়াখানা নির্মাণ কাজ চলছে।

চিড়িয়াখানায় দেশি প্রজাতির পাশাপাশি বিদেশ থেকে বিভিন্ন প্রজাতির বেশ কিছু প্রাণী কিনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। যার মধ্যে প্রায় দুই শতাধিক প্রাণী হবে বিরল ও নতুন প্রজাতির। ইতোমধ্যে জেব্রা, টলা, ঘোড়া, বন বিড়ালসহ বেশ ক’টি প্রাণীর জন্য আলাদা আলাদা স্থান নির্ধারণ করে অবকাঠামোর নির্মাণ করা হচ্ছে।

টিলাগড় ইকোপার্কে এখন টিলাগুলো অক্ষত রেখেই বিভিন্ন প্রাণীর শেড তৈরি করা হচ্ছে। জেব্রা, হরিণ, ময়ূর, টলা ও বন বিড়ালের জন্য স্থান নির্ধারণ করে শেড তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। কোথাও কোথাও প্রায় ৫০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। তবে অন্যান্য প্রাণীর শেড নির্মাণ কাজ এখনও শুরু হয়নি।

২০১২ সালের ৩ অক্টোবর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ আন্তঃমন্ত্রণালয়ের এক সভায় সিলেটে দেশের তৃতীয় সরকারি চিড়িয়াখানা নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। একই বছরের ৯ নভেম্বর ইকোপার্ক এলাকায় প্রস্তাবিত চিড়িয়াখানার জায়গা পরিদর্শন করেন তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল হাই এমপি।

প্রাথমিকভাবে ৮ একর জায়গা নিয়ে এবং পরবর্তিতে ৩০ একর জমিতে এ চিড়িয়াখানা সম্প্রসারণ করা হবে। এর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ কোটি ৭৯ লাখ ১৪ হাজার টাকা।

চলতি বাজেটে এ চিড়িয়াখানার জন্য অর্থ অনুমোদন দেওয়া হয় এবং গত মে মাস থেকে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে।

জানা গেছে, চিড়িয়াখানায় নির্মাণ হবে সিআইসিট স্টাফ ব্যারাক, জেব্রা শেড, সাইড ড্রেন, টিকেট কাউন্টার, অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ সংযোগ, বন বিড়াল ও গন্ধগোকুলের ঘর নির্মাণ, ৪টি সেন্ট্রি পোস্ট নির্মাণ, ২টি বক্র কালভার্ট নির্মাণ, ফিজেন্ট এভিয়ারি নির্মাণ, বিদ্যমান পুকুর পুনঃখনন, ফিড এন্ড ফুড প্রিজারভেশন স্টোর নির্মাণ, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ, ৫টি আরসিসি বেঞ্চ নির্মাণ, তৃণভোজী প্রাণীর শেড ও বেষ্টনী নির্মাণ, পানি সরবরাহ শ্যালো টিউবওয়েল নির্মাণ।

এ ছাড়াও আহত ও উদ্ধারকৃত বন্যপ্রাণীর চিকিৎসার নিমিত্তে বন্যপ্রাণীর পুনর্বাসন ও হাসপাতাল স্থাপন। এই চিড়িয়াখানায় থাকবে- সিংহ, হনুমান, বেজী, বনরুই, বাঘডাসা, বনবিড়াল, শেয়াল, খেকশিয়াল, গন্ডার, এশীয় হাতি, পরিযায়ী পাখি, জলজ পাখি, বনছাগল, বিভিন্ন প্রজাতির বানর, কালো ভাল্লুক, মিঠা পানির কুমির, নীল গাই, জলহস্তী ইত্যাদি।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানিয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে বেশিরভাগ প্রাণী কেনা হবে। ৪০ প্রজাতির প্রায় সোয়া চারশ’ প্রাণী ক্রয় করা হবে। যার মধ্যে দু’শ প্রাণীই থাকবে বিরল ও নতুন প্রাণী।

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, চিড়িয়াখানার প্রাণীদের স্বাস্থ্য ও নানা ধরনের সেবার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি থেকে চিকিৎসা ও খাদ্যের মান পরীক্ষার জন্য আধুনিক মানের উপকরণ কেনা হবে। সিলেটের জনসাধারণ ও ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই চিড়িয়াখানাটি হবে একটি আকর্ষণীয় বিনোদন কেন্দ্র।

তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে এটিকে প্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেই আমরা কাজ শুরু করেছি। ৩ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ হলে ভবিষ্যতে এ প্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রই পূর্ণাঙ্গ চিড়িয়াখানায় রূপ পাবে। নির্মাণ কাজ শেষ হলে এটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হবে। গ্রীষ্মে সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আর শীতে সকাল ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত প্রতিদিন এ কেন্দ্র খোলা থাকবে।

সিলেট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. নুরুল ইসলাম জানান, বন বিভাগের জায়গায় চিড়িয়াখানা নির্মাণ হচ্ছে বিধায় কাজটি তারা করছে। তবে নির্মাণ কাজ শেষ হলে প্রাণী সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ আমাদের দপ্তর থেকেই করা হবে।

প্রসঙ্গত, দেশে বর্তমানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দু’টি চিড়িয়াখানা চালু রয়েছে। এর মধ্যে একটি ঢাকার মিরপুরে এবং অন্যটি রংপুর শহরে। সিলেটে প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত এই চিড়িয়াখানা নির্মাণ কাজ শেষ হলে এটি হবে দেশের তৃতীয় সরকারি চিড়িয়াখানা।

পর্যটন ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ সিলেটে পর্যটন আকর্ষণ বাড়াতে চিড়িয়াখানার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সিলেটে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকলেও সরকারি ব্যবস্থাপনায় কোন চিড়িয়াখানা নেই।

সিলেটবাসী এবং সিলেটে যারা মাজার জিয়ারত বা বেড়াতে আসতেন তাদের জন্য শহরের নিকটবর্তী কোন চিত্তবিনোদনের জায়গা ছিল না। তাই ২০০৬ সালে ১১২ একর জায়গা নিয়ে মূলত সিলেটবাসীদের এবং বিদেশী পর্যটকদের মন আকৃষ্ট করার ও তাদের চিত্তবিনোদনের সুযোগ করে দিতে সিলেট শহরের এমসি কলেজ সংলগ্ন আলুরতলে টিলাগড় (খাদিমনগর) ইকোপার্ক গড়ে তোলা হয়।

সুফি সাধক হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহ পরান (রহ.)-এর পবিত্র মাজার শরীফ জিয়ারত, জাফলং, দেশের একমাত্র সোয়াম্প (জলা বন বা জলমগ্ন বন) ফরেস্ট রাতারগুলসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক শোভামন্ডিত সিলেটে সরকারি চিড়িয়াখানা নির্মাণের উদ্যোগ নেন অর্থমন্ত্রী। এটি নির্মিত হলে সিলেটের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হবে বলে মনে করেন সিলেটবাসী।

ঢাকা, ১৮ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএমএ