অতিদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয় মনজিল হোসেন। তার বাবার ছিলনা কোনো ভিটেমাটি। বাবার সংসারের অভাব অনটনের কারণে লেখা-পড়ার সুযোগ পায় নি মনজিল হোসেন।

সে যুবক বয়স থেকেই অন্যের বাড়িতে শ্রম দিয়ে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল। তখন এক বেলা খেতে পারলেও আরেক বেলা না খেয়ে থাকতো। এমনকি পরের বাড়িতে কুড়ে ঘর তুলে বসবাস করতো।

আর সেই ঘরে ছাউনি দিতে না পাড়ায় একটু বৃষ্টি হলে গড়িয়ে পড়তো পানি। এভাবে শত যন্ত্রণা আর নানা বেদনা ও দারিদ্রতার কষাঘাতের মধ্য দিয়ে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে আসছিল মনজিল হোসেন।

তার ছিলনা স্বাধীনতা, ছিলনা কোনো আত্মমর্যাদা। তবুও তিনি মনোবল হারায় নি। নিজেকে সামাজিক মর্যাদায় ফিরে আনবেই, এটাই ছিল তার দৃঢ় মনোবল। গাইবান্ধা জেলার সাদুল্যাপুর উপজেলাধীন নলডাঙ্গা ইউনিয়নের মান্দুয়ার পাড়া গ্রামের দিনমজুর মজিবর রহমানের ছেলে মনজিল হোসেন।

প্রায় বছর দশেক পুর্বে অন্যের নিকট ২শত টাকা ধার নিয়ে শুরু করে পোনা মাছের ব্যবসা। বগুড়ার সোনাতলা-আদমদীঘি এলাকা থেকে পোনা মাছ কিনে নিজ এলাকায় বাইসাইকেলে করে গ্রাম-গঞ্জে বিক্রি করতে থাকে। এ ব্যবসায় কিছুটা লাভের মুখ দেখায় তিনি পরিকল্পনা আটেন মৎস্য রেনু কিনে পোনা উৎপাদন ও বাজারজাত করনের ব্যবসা।

তার পরিকল্পনা অনুযায়ী কিছুদিন যেতে না যেতেই স্থানীয় একটি পুকুর বর্গা নিয়ে শুরু করেন পোনা উৎপাদন। আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। অক্লান্ত পরিশ্রম এবং একাগ্রতায় চলে তার কর্মকান্ড।

পোনা উৎপাদন ও বাজারজাত করে সুফল পাওয়ায় এলাকায় আরও কয়েকটি পুকুর লিজ নিয়ে পোনা উৎপাদনসহ মাছ চাষ শুরু করেন। এভাবে শুরু হয় আয়ের উৎস।

সফল মৎস্য চাষী মনজিল হোসেন নিজের ভাগ্যের উন্নয়নে ও মাছ চাষের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, সেই ফেরি করে পোনা বিক্রি করে লাভের মুখ দেখে এ কর্মপরিকল্পনা ঠিক করি। ধারাবাহিকতা অব্যহত রেখে তিন একর পরিমান পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতীর মৎস্য চাষ করেন।

তিনি রুই, কাতলা, মৃগেল, থাইপুটি, বাটার মুসা সহ উন্নত জাতের কই ও শিং মাছ ইত্যাদি মাছ চাষ করেন। এখন তার মৎস্য খামারে প্রতিদিন ১০/১২জন শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে।

মনজিল হোসেন জানান, মৎস্য চাষ করে বার্ষিক আয় হয় প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা। মাছের খাদ্য, পরিচর্যা, শ্রমিকের মজুরী, ৩ ছেলে ও মেয়ের লেখা-পড়ার খরচ সহ মৌলিক চাহিদা মিটিয়েও তিনি বছরে প্রায় লক্ষাধিক টাকা নীট আয় করেন।

তিনি এখন আর কুড়ে ঘরে থাকেন না। কিনেছেন জমি, করেছেন একটি একটি আদর্শ বাড়ি। এসবের ফলে মৎস্য চাষ করে দারিদ্রতাকে 'গুডবাই' জানিয়েছেন মনজিল হোসেন।

তার এখন অভাব বলতে আর কিছুই নেই। নিজের মেধা প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে ও কঠোর পরিশ্রম করে তিনি আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। মাছ চাষে বদলিয়েছেন নিজের ভাগ্য।

তিনি শুধু সফল মৎস্য চাষীই নন, এখন তিনি স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন। তার পরামর্শে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মৎস্য চাষীরাও উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন এবং মাছ চাষ করে লাভবান হচ্ছেন।

সাদুল্যাপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, মঞ্জিল হোসেন নিঃসন্দেহে একজন সফল মৎস্য চাষী। তার খামারের মাছ বিভিন্ন এলাকায় বাজারজাত করে আমিষ জাতীয় খাদ্যের ঘাটতি পুরণ করছে। মৎস্য চাষী মনজিল হোসেনের স্বাবলম্বিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করায় তাকে একাধিকবার পুরস্কৃত করা হয়েছে।

এমকে