২২ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবার একমাত্র প্রতিষ্ঠান কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতালে চিকিৎসকসহ লোকবল সংকটে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে সেবা কার্যক্রম। চিকিৎসক না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা পাচ্ছে না কুষ্টিয়াসহ চার জেলার মানুষ। ১৯৬৩ সালে স্থাপিত এ হাসপাতালের শুরুতে শয্যা সংখ্যা ছিল ১৫০।

২০০৫ সালে উদ্বোধন হলেও ২০১০ সালে হাসপাতালটিতে ২৫০ শয্যার কার্যক্রম শুরু হয়। ফলে এখন শুধু কুষ্টিয়া নয়, আশপাশের জেলা ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও রাজবাড়ীর মানুষের উন্নত চিকিৎসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এই হাসপাতাল। তবে হাসপাতালের পরিধি বাড়লেও সেভাবে বাড়েনি লোকবল, বাজেট এবং সেবার মান।

বছরখানেক আগে চিকিৎসাসেবায় খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন এবং সারাদেশে রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করলেও এই প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে রোগীদের অভিযোগের অন্ত নেই।

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. তাপস কুমার সরকার জানান, জনবল কাঠামো অনুযায়ী হাসপাতালে সব মিলিয়ে ৫৮ চিকিৎসক থাকার কথা। সেখানে আছেন মাত্র ৩৩ জন। এ ছাড়া সেবিকা ও বিভিন্ন বিভাগের টেকনোলজিস্টসহ অন্য ৭১টি পদে লোকবল নেই।

তিনি আরও জানান, হাসপাতালটি ২৫০ শয্যার হলেও প্রতিদিন ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ রোগী ভর্তি থাকে এখানে। এ ছাড়া প্রতিদিন বহির্বিভাগে আসা প্রায় এক হাজার ৫০০ রোগীর সেবা দিতে অন্তত ১৫ চিকিৎসকের প্রয়োজন থাকলেও তা সামলাতে হচ্ছে ৫ চিকিৎসক দিয়ে।

তিনি বলেন, তাকে একাই দিন-রাত সামাল দিতে হচ্ছে। অবসরের সময় পাওয়া যায় না। জরুরি বিভাগের ৪টি পদ থাকলেও পদ সশূন্যতায় মাত্র একজন চিকিৎসককে দিয়ে কাজ চালাতে হয়।

সার্জিক্যাল বিভাগে কনসালট্যান্ট চিকিৎসকের ৩টি পদের মধ্যে একজনকে দিয়েই কাজ চালাতে হচ্ছে। হাসপাতালের একমাত্র মেডিসিন কনসালট্যান্ট সালেক মাসুদ এক বছর আগে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজে বদলি হয়েছেন। এরপর আজ আবদি ওই পদে কোনো কনসালট্যান্টকে স্থলাভিষিক্ত করা হয়নি।

প্রায় দেড় বছর আগে গাইনি কনসালট্যান্ট রুমী ফরহাদ আরা কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজে বদলি হলেও সেখানে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। দুই বছর ধরে নেই অ্যানেসথেসিয়া কনসালট্যান্ট।

ডা. তাপস কুমার সরকার বলেন, হাসপাতালে মাত্র ৩টি অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। রোগীর যা চাপ তাতে আরও ৩টি অপারেশন থিয়েটার দরকার। এ ছাড়া শল্যচিকিৎসার রোগীদের ক্ষেত্রে ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি। সিরিয়ালের জটিলতায় দিনের পর দিন ঘুরতে থাকার অভিযোগ রয়েছে।

বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের দিনভর লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাওয়ার ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। ভেড়ামারা উপজেলার সালেহা খাতুন তার সাড়ে তিন মাসের বাচ্চাকে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ডাক্তার দেখাতে বহির্বিভাগের টিকিট নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে সময় লেগেছিল দুই ঘণ্টা। টিকিট নিয়ে শিশু বিভাগের ডাক্তারের কক্ষে সিরিয়াল দিয়ে দুপুর ২টা পর্যন্ত অপেক্ষা শেষে ডাক্তার চলে যান।

কুমারখালী উপজেলার বানিয়াপাড়া গ্রামের ভ্যানচালক আজিজুল মূত্রনালির জটিলতায় ভর্তি হয়েছিলেন এ হাসপাতালে। ভর্তি পর সাত দিন চিকিৎসা চলাকালীন থেকে ছাড়পত্র পাওয়া পর্যন্ত সব ওষুধ বাইরের দোকান থেকে ক্রয় করতে তার জীবিকার একমাত্র বাহন ভ্যানগাড়িটি বিক্রি করতে হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে হয়রানির ঘটনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কতিপয় অসাধু চিকিৎসকের বিরুদ্ধে রোগীদের ভালো চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন ক্লিনিকে প্রেরণের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। অপ্রয়োজনে বিভিন্ন ডায়াগোনসিস আইটেমের তালিকা রোগীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে চিকিৎসকের পছন্দের ক্লিনিকে যেতে বাধ্য করানোর ঘটনা ঘটছে।

হাসপাতালের কয়েকটি ফ্লোরে ময়লা-আবর্জনা পড়ে আছে। গন্ধে রোগীরা নাক বন্ধ করে হাঁটছে। পরিষ্কার করার লোক নেই। এ ছাড়া টয়লেট থেকে ময়লা পানি বের হয়ে ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ছে। এসব বিষয় দেখার কেউ নেই।

এ ছাড়া আগের মতো জরুরি বিভাগের সামনে দালালদের জটলা দেখা গেছে। বটতৈল এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মোতালেব নামের এক রোগী জানান, রক্ত পরীক্ষা দিলেও হাসপাতাল থেকে করাতে পারেননি। পরে হাসপাতালের সামনের একটি ডায়াগনস্টিক থেকে করাতে বাধ্য হয়েছেন।

হাসপাতালের তত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. আবদুল মান্নান বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারপরও আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি রোগীদের কাঙ্খিত সেবা দিতে। চিকিৎসক সংকট থাকায় অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের সেবা পেতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। আমরা কর্তৃপক্ষকে এসব বিষয় অবহিত করেছি।

সিভিল সার্জন ডা. মুস্তাফিজুর রহমান জানান, কুষ্টিয়ার ছয়টি উপজেলার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে অপেক্ষাকৃত নবীন চিকিৎসকদের দিয়ে কোনোভাবে কাজ চালাতে পারলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য জেনারেল হাসপাতালে আসা রোগীদের সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কারণ চিকিৎসক সংকট। এ ছাড়া রোগীদের বিভিন্ন ক্লিনিকে পাঠানোর অভিযোগও আসে কিছু কিছু চিকিৎসকের বিরুদ্ধে।

এমই