লিবিয়ায় জঙ্গিদের হাতে অপহৃত বাংলাদেশী শ্রমিক হেলাল উদ্দিন এখনও জীবিত আছেন বলে নিশ্চিত করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা।

অপহরণের ১৮ দিনের মাথায় আজ (মঙ্গলবার) হেলাল তার পরিবারের সাথে মোবাইলে কথা বলেছেন বলেও নিশ্চিত করেছেন জামালপুরে হেলালের পরিবারের সদস্যরা।

অপহরণকারীরা আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে তাকে মুক্তি দিবে বলেও হেলাল তার পরিবারকে জানিয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। অপহরণকারীদের কাছ থেকে এমন কথা জানতে পেরেছেন বলেও পরিবারকে জানান হেলাল।

আজ সকাল সাড়ে দশটার দিকে হেলালের ফোন পাবার পর শুধু তার পরিবারই নয় হেলালের গোটা গ্রামজুড়ে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়।

       অপহৃত হেলাল ডানে, আরেক অপহৃত আনোয়ার বামে

জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ গজারিয়া গ্রামের মানুষ- যারা হেলালের মুক্তির জন্য বার বার প্রার্থনা করেছেন- তাদের সবার মধ্যে ফিরে এসেছে স্বস্তি।

তবে, চার মিনিটের মোবাইল আলাপে হেলাল তার অপহরণকারীদের সম্পর্কে কোন কথা বলেননি। এমনকী এই মুহুর্তে তাকে কোথায় রাখা হয়েছে সে ব্যাপারেও কিছু জানাননি তিনি।

উল্লেখ্য, গত ৬ই মার্চ হেলাল উদ্দিন এবং লিবিয়ায় কর্মরত আরেক বাংলাদেশী শ্রমিক নোয়াখালীর আনোয়ার হোসেনকে (৩৮) লিবিয়ার দক্ষিণের শহর সোয়াতের আল-ঘানি তেল ফিল্ড থেকে অপহরণ করে অপরিচিত সন্ত্রাসীরা।

একইসঙ্গে, সন্ত্রাসীরা চারজন ফিলিপাইনের, একজন অস্ট্রেলিয়ার, একজন চেক প্রজাতন্ত্রের এবং ঘানার একজনসহ অপর সাত বিদেশী শ্রমিককেও অপহরণ করে।

অপহরণের ১৮ দিনের মাথায় সন্ত্রাসীরা তাদেরই একটি মোবাইল ফোন থেকে হেলাল উদ্দিনকে তার স্ত্রী আলেয়া খাতুনের সাথে কথা বলার সুযোগ করে দিল।

তিন মেয়ে ও দুই ছেলের জনক হেলাল প্রথমে তার বিধ্বস্ত স্ত্রীর কাতর কন্ঠ চিনতে পারেননি বলে স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান বড় মেয়ে হেলেমা।  

অনেক দিন পরে হেলালের কণ্ঠ শুনতে পেরে আনন্দের আতিশয্যে পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

বড় মেয়ে আরও জানান, আমরা বাবার শরীরের খোঁজ-খবর জানতে চাইলে তিনি শুধু বলেন, আমি বেঁচে আছি।

কখন তাকে মুক্তি দেয়া হবে-বড় মেয়ে মোবাইল আলাপকালে বাবাকে জিজ্ঞেস করলে হেলাল বলেন, অপহরণকারীরা আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে তাকে মুক্তি দেবেন বলে তাদের আলাপে তিনি শুনেছেন।

তাকে কী খেতে দেয়া হয়- জানতে চাইলে হেলাল তার পরিবারকে জানায়, প্রতিদিন একবার তাকে হালকা খাবার দেয়া হয়।

হেলালের সাথে খাবার নিয়ে আলাপের সাথে সাথেই মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে আলাপের এই পর্যায়ে অপহরণকারীরা মোবাইল ফোনটি হেলালের কাছ থেকে নিয়ে যায়।

এদিকে, এর আগে গত ৯ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বহুল আলোচিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) হেলালসহ ওই শ্রমিকদের অপহরণ করে।

অপরদিকে, লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা জানান, তারা লিবিয়ার কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি ফিলিপাইন ও অস্ট্রেলিয়ার দূতাবাসের সাথে একযোগে অপহৃতদের উদ্ধারে কাজ করছেন।  

তবে, অপহৃত দুই বাংলাদেশী শ্রমিকের পরিবার ঘটনার পর থেকেই ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের দিন পার করছেন।  

হেলাল উদ্দিনের দুই ছেলের একজন রুবেল (১৩) জানান, তার বাবা অপহৃত হওয়ার খবরে তারা এতটাই ভেঙ্গে পড়েছেন যে সে আর স্কুলে যায় নি।

জেলার আদারভিটা হাইস্কুলের নবম শ্রেনীর ছাত্র রুবেল বলেন, সবাই শুধু কান্না করছেন। এর মধ্যে তিনি কিভাবে স্কুলে যাবেন?

হেলালের স্ত্রী আলেয়া খাতুন বলেন, তার স্বামী-যিনি পেশায় ছুতার মিস্ত্রি-সবশেষ বাংলাদেশে এসেছিলেন ১০ মাস আগে।

হেলালের স্ত্রী আরও জানান, এর আগে তিনি ২০০৮ সালে দুবাই গিয়েছিলেন। কিন্তু ছয় মাস পরেই আবার দেশে ফেরত আসেন। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় হেলাল পাড়ি জমায় লিবিয়া।  

লিবিয়ায় এই কাজ পেতে হেলালকে ১০ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছিল বলেও জানান স্ত্রী আলেয়া। নিজের জমি বিক্রি করে এবং আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে ধার করে হেলাল ওই অর্থ জোগাড় করেছিলেন।

      কান্নারত অপহৃত আনোয়ারের পরিবারের সদস্যরা

এদিকে, অপহৃত অপর বাংলাদেশী নোয়াখালীর আনোয়ার হোসাইন পেশায় একজন ডিপ্লমা ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার। তিনি প্রথমে ২০১০ সালে এবং পরবর্তীতে ২০১২ সালে লিবিয়ায় যান বলে তার পরিবার সূত্রে জানা যায়।

এর আগে আনোয়ার ২০০১ সাল থেকে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে ২০০৭ সালে দেশে ফিরে মারুফা খাতুন নামে একজনকে বিয়ে করেন।

এই দম্পতির দুই সন্তান রয়েছে। এরা হলো-রাহিন (৭) এবং রাইসা (৫)। দুই সন্তানই ঢাকার মাতুয়াইল ক্রিয়েটিভ  ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থী।

আনোয়োরের স্ত্রী জানান, স্বামীর অপহরণের খবর শোনার পর তিনি অনেকবার তার মোবাইলে ফোন দিয়ে সন্ধান জানার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু স্বামীর মোবাইল বন্ধ পেয়েছেন।

তিনি আরও জানান, পরে লিবিয়ায় আনোয়ারের বন্ধু মইনুল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করেন। আনোয়ারকে আইএসইএসের সদস্যরা অপহরণ করেছে বলে ওই বন্ধুর মাধ্যমেই জানতে পেরেছেন বলেও দাবি করেন স্ত্রী মারুফা।   

গত ৫ মার্চ আনোয়ারের সাথে সবশেষ আলাপ হয় জানিয়ে তিনি আরও বলেন তখন পর্যন্ত সব কিছুই ঠিক ছিল। কিন্তু হঠাৎই সব ওলোটপালোট হয়ে যায়। এখন প্রতিটি মুহুর্ত কাটছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে।

আনোয়ারের শ্যালক মাহমুদ ইকবাল বলেন, তিনি তার দুলাভাইয়ের মুক্তির আশায় প্রতিনিয়ত ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় এবং ত্রিপোলিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ রাখছেন।

কেবি