‘আমি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র। ঘূর্ণিঝড়ের আগের দিন শহর থেকে গিয়েছিলাম আনোয়ারার রায়পুর গ্রামের বাড়িতে। ২৯ এপ্রিলের ভয়াল রাতে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করে বেঁচে গিয়েছিলাম। কিন্তু হারাতে হয়েছে জ্যাঠাতো ভাই ফয়েজ, তার ছেলে বাদশা ও মেয়ে মুন্নীসহ বাড়ির তিনটি পরিবারের ১৬ জন সদস্যকে’।

পেশায় সাংবাদিক শামসুল ইসলাম আটাশ বছর আগের বিভীষিকাময় সেই রাতটির কথা এখনও স্মৃতি থেকে মুছতে পারেননি।

দিনটি ছিল সোমবার। বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা লোনা জলের সাথে সারা রাত যুদ্ধ করে ফিরে পেয়েছিলেন নতুন জীবন। মা আর ভাগনি বিলকিসকে বাড়ির কাছেই জীবন্মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। চোখের সামনে শ্যাওলার মতো ভেসে যেতে দেখেছেন নারী-পুরুষ আর শিশুর মরদেহ। ভাসতে থাকা মানুষের মৃত্যুপূর্ব গোঙানির শব্দ শুনেছেন তিনি।

আলোকচিত্রী শিশির বড়ুয়ার ফ্রেমে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবলীলা বন্দি হয়েছে। প্রায় ৬০টি ছবি সংগ্রহে আছে তার। শিশির বড়ুয়া বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের পরদিন ভোর পাঁচটায় ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। কোনো যানবাহন নেই। চারিদিকে মানুষের ক্ষত-বিক্ষত মরদেহ, গবাদি পশুর পচাদেহ। ভাঙা গাছপালা, চাল উড়িয়ে নেওয়া বাড়িঘর। কর্মচঞ্চল জনপদ সেদিন পরিণত হয়েছিল বিরানভূমিতে’।

বন্দর থেকে শুরু করে কাঠগড়, উত্তর ও পশ্চিম পতেঙ্গা, আনোয়ারার গহিরা, পারকি সৈকত এলাকা থেকে ছবি তুলেছেন তিনি। অবাক বিস্ময়ে দেখেছেন সমুদ্রচরে লাল কাঁকড়ার কাণ্ড। একটি লাশকে প্রায় ৪৫ মিনিটের মধ্যেই সাবাড় করে ফেলতে পারে তারা। দুর্লভ এ দৃশ্যের ছবিও তোলা আছে তার। আছে এসিড বৃষ্টিতে ঝলসে যাওয়া গাছপালা, জলোচ্ছ্বাস কবলিত মানুষের ত্রাণের জন্য আর্তনাদের ছবিও।

ভয়াল এ তাণ্ডবলীলা নিয়ে বই লিখেছেন গবেষক সাখাওয়াত হোসেন মজনু। ‘ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস আর্তনাদ করুণ কান্না’ নামের ওই বইটি বিক্রি করে সংগৃহীত ৫ লাখ টাকা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দানও করা হয়েছিল।

সাখাওয়াত হোসেন মজনু বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের পরদিন থেকে উত্তর পতেঙ্গা, কুমিরা, সমুদ্রসৈকত, বিমান বন্দর, আনোয়ারা, বাঁশখালী, সন্দ্বীপ, উড়িরচরসহ প্রত্যন্ত উপকূলীয় এলাকা ঘুরে দেখেছি। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। সব ঘটনাই বইয়ে তুলে ধরেছি। এটি প্রামাণ্য দলিল’।

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর ১৩৩ কিলোমিটার সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা খরচ করা হলেও এর সুফল পায়নি উপকূলবাসী। বাঁশখালী, আনোয়ারা, সন্দ্বীপসহ বিভিন্ন উপজেলায় বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে ২৬শ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। পতেঙ্গসহ বিভিন্ন উপজেলায় ৮০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ হচ্ছে।

পতেঙ্গা থেকে সলিমপুর পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার সাগর উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ২২ কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধ আছে। বাঁশবাড়িয়া এলাকায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ চলছে। বাঁশখালীতে ৩৩ কিলোমিটার সাগর উপকূলীয় এলাকায় ২৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ চলছে।

আনোয়ারায় চার কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় দুই কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধ রয়েছে। বর্তমানে ৩১২ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চলছে। সন্দ্বীপে ৫৮ কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে ১৯৬ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চলছে। এই প্রকল্পে ৯.৭ কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হবে। মিরসরাইয়ে উপকূল এলাকায় ১৭শ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে সব প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। এতে সমুদ্র উপকূল এলাকা সুরক্ষিত হবে বলে আশা করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পূর্ব রিজিয়ন) এ কে এম সামশুল করিম।