বাংলাদেশের অধিকাংশ যুবরাই ধনী হওয়ার চেয়ে সৎ হওয়াকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
তাদের ধারণা, অসৎ ব্যক্তির চেয়ে সৎ ব্যক্তির জীবনে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর এই সততার ধ্যান-ধারণা, চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীরা তাদের প্রভাবিত করেছে।
দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা ট্রারেন্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক জরিপে বাংলাদেশের যুব সমাজ সম্পর্কে এই তথ্য উঠে এসেছে।
সংস্থাটির মতে, সততা সম্পর্কে দেশের যুবদের ধারণা স্বচ্ছ। তবে তারা বাস্তব জীবনে সেটির প্রতিফলন ঘটাতে পারেন না।
এজন্য জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সততা প্রতিষ্ঠায় যুবদের ভূমিকা অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়েছে টিআইবি।
মঙ্গলবার ধানমন্ডি কার্যালয়ে টিআইবি ‘জাতীয় যুব-সততা জরিপ ২০১৫’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে যুবদের সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরেন গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মনজুর-ই-খোদা ও শাম্মী লায়লা ইসলাম।
এ সময় টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে আরো উপস্থিত ছিলেন- নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপনির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান প্রমুখ।
জরিপ সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বহুপর্যায়ী স্তরায়িত গুচ্ছ নমুনায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে সততা ও দুর্নীতি সম্পর্কে যুবদের ধারণা, মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি নিরূপণ, বিভিন্ন সেবাখাতে যুবদের দুর্নীতির অভিজ্ঞতা, দুর্নীতি প্রতিরোধে যুবদের জ্ঞান, আগ্রহ ও অঙ্গীকারের মাত্রা যাচাই করা হয়েছে।
২০১৫ সালের ২২ এপ্রিল থেকে ৭ মে সময়ের মধ্যে এই জরিপ চালানো হয়। জরিপে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সের ব্যক্তিদের যুব হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। জরিপে বাংলাদেশের ৬৪ জেলা থেকে ৩১টি জেলার মোট ৩,৬৫৬ জনের অভিমত নেয়া হয়েছে, যার এক-তৃতীয়াংশ নারী।
জরিপে যুবদের প্রায় সবাই সততার অভাবকে দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের জন্য একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
কখনো দুর্নীতি করে না, কোনো পরিস্থিতিতেই ঘুষ নেয়ও না, দেয়ও না- এমন মানুষকে প্রায় ৯৮ শতাংশ যুব সৎ বলেছে।
অধিকাংশ যুবরাই ধনী হওয়ার চেয়ে সৎ হওয়াকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। অসৎ ব্যক্তির চেয়ে সৎ ব্যক্তির জীবনে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে জরিপে বেশিরভাগ যুবরা একমত পোষণ করেছে।
আবার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পাস করা অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো চাকরি পাওয়ার জন্য ব্যর্থ হতে পারেন জেনেও কোনো প্রতারণার আশ্রয় নেবেন না বরং সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলে মনে করেন জরিপের অংশগ্রহণকারী ৭৩ শতাংশ নারী ও ৬৫ শতাংশ পুরুষ।
কোনো আত্মীয় নিয়ম-বহির্ভূতভাবে ভাল কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি অথবা কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিতে চাইলে বেশিরভাগ যুবই সরাসরি না বলবেন বলে জরিপে অভিমত দিয়েছেন।
জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্নীতি দমন ও সততা প্রতিষ্ঠায় যুবদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে ৮২ শতাংশ যুব মতামত দিয়েছে। অধিকাংশ যুবরাই (৮০%) দুর্নীতির মুখোমুখি হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করবেন এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
বেশিরভাগ যুব জানিয়েছে, পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীরা সততার ধ্যান-ধারণা, চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে তাদের প্রভাবিত করে।
সার্বিকভাবে সততা সম্পর্কে যুবদের ধারণার মাত্রা বেশ স্বচ্ছ হলেও বাস্তবে সততা চর্চার ক্ষেত্রে যুবদের একটি বড় অংশের মধ্যে বিপরীত বা নেতিবাচক আচরণ পরিলক্ষিত হয়।
দেশের বিদ্যমান দুর্নীতিবিরোধী আইন-কানুন, বিধিমালা সম্পর্কে জানেন মাত্র ১ শতাংশ এবং ৫৮ শতাংশ কিছুই জানেন না বা তাদের কাছে এ সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জরিপের ফল অনুযায়ী, সততা সম্পর্কে জোরাল নৈতিক ধারণা থাকা সত্ত্বেও যুবদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তব জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সততা বিসর্জন দিতে বা সমঝোতা করতে রাজি আছে; অনেক ক্ষেত্রে তারা দুর্নীতি মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
যারা অভিযোগ করতে আগ্রহী নন তাদের মধ্যে ৬২ শতাংশ যুব মনে করে এ ধরনের অভিযোগে কোনো কাজ বা ফল হবে না।
যুবরা রাজনীতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে সরকারি সেবা খাতগুলোকে তারা বেসরকারি সেবা খাতগুলোর তুলনায় বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত বলে মনে করছে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল বলেন, ‘বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ দেখতে চাইলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো উন্নত ও যুগোপযোগী করা অত্যন্ত জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘সমাজে যুবদের সংখ্যা অনেক বেশি, তাই তারা যাতে সততার চর্চা করতে পারে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে তরুণদের ভূমিকা পালনের যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিকসহ দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিটি আন্দোলনে তরুণদের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। কিন্তু অধিকাংশ যুবদের মধ্যে দুর্নীতি সম্পর্কে ধারণা কম।’
তিনি বলেন, ‘অনেকেই অন্য কোনো উপায় নেই জেনে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়। সে বিষয়টি মাথায় রেখে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যেও দুর্নীতি বিরোধী চেতনা জাগিয়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্তদের যুবদের ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।’
গবেষণার প্রতিবেদনে টিআইবি ছয়টি সুপারিশও তুলে ধরেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- দুর্নীতি যে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ তা বাস্তবিক অর্থে সমাজে প্রতিষ্ঠা করা, শাস্তি থেকে অব্যাহতির সংস্কৃতি বন্ধ করা, যুবদের মধ্যে সততার প্রসার ও চর্চার বিষয়টিকে জাতীয় যুব নীতিতে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া, জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সততা প্রতিষ্ঠায় যুবদের ভূমিকা ও কর্মপরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা।
এছাড়া যুবদের জন্য দুর্নীতির অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত সৃষ্টি করা, পাঠ্যক্রমে বিদ্যমান সততা ও দুর্নীতি দমন বিষয়ক শিক্ষা আরো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা, যুবদের মাঝে সততা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য সকল অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে সমন্বিত কর্মসূচি ও প্রচারাভিযান কর্মসূচির সুপারিশও করা হয়েছে টিআইবির জরিপ প্রতিবেদনে।
এসএইচ





