পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগের ব্যাপারে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এর পেছনে একটি স্বার্থান্বেষীমহল কাজ করেছে। বিশ্বব্যাংকের কাছে যারা দুর্নীতির অভিযোগ দিয়েছিলেন এর মধ্যে বর্তমান সরকারের দুইজন মন্ত্রীও রয়েছেন। তারা নবম সংসদের মন্ত্রী পরিষদে ছিলেন না।

গতবারের মন্ত্রী পরিষদে ঠাঁই না পেয়ে, শেখ হাসিনার ওপর প্রতিশোধ নিতেও চেষ্টা কম করেননি। আর শেখ হাসিনার ঘনিষ্ট বিশ্বস্ত হিসাবে কাজ করার কারণে সৈয়দ আবুল হোসেনকে বিচ্ছিন্ন করতে মন্ত্রীপরিষদ থেকে সরানোর কাজ করেন। 

চক্রান্তকারীদের ঘনিষ্ট তিনজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বও রয়েছেন। তারাও বিশ্বব্যাংকের কাছে বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। এই সব তথ্য সম্প্রতি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। 

বিশ্বব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্রও শেখ হাসিনার ঘনিষ্ট একটি সূত্রকে জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের কাছে যারা অভিযোগ দিয়েছেন এরমধ্যে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রয়েছেন।

গত এপ্রিল মাসে তথ্য আসার পর আপাতত ওই দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলেও  তাদেরকে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। ওই দুই মন্ত্রী ঠিক কী কী তথ্য দিয়েছেন তার কপি পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। ইতোমধ্যে তারা যে সব তথ্য সরবরাহ করেছেন বিশ্বব্যাংকের কাছে তা জানতে পেরেছেন। প্রমাণের জন্য নথিগুলোও সংগ্রহ করার চেষ্টা করছেন।

পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন হোক এটা চাননি বর্তমান সরকারের দুই মন্ত্রী। বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, দুই মন্ত্রীর একজন মন্ত্রী হলেন সরকারের বর্তমান একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। আওয়ামী লীগের নেতা। যিনি এর আগের মন্ত্রী পরিষদে ছিলেন না।

তিনি ও তার ঘনিষ্ট কয়েকজন সরকারের এত বড় প্রকল্প যাতে বাস্তবায়িত না হয় সেই জন্য কাজ করেন। তিনি চেয়েছিলেন সরকার এমন কোনো কাজ যাতে না করতে পারে। তার লক্ষ্য ছিল গত সরকারের আমলে বড় কোনো প্রকল্প যাতে বাস্তবায়িত না হয়।

যাতে সরকারের দীর্ঘ মেয়াদে সাফল্য না আসে। ওই নেতা ও মন্ত্রী ওয়ান ইলভেনের সময়ে শেখ হাসিনার বিরোধিতা করেন ও সংস্কারবাদির খাতায় নাম লেখান। এই অভিযোগে শেখ হাসিনা গত মেয়াদে সরকার গঠন করলেও তাকে মন্ত্রী করেননি। পাঁচ বছর তাকে শাস্তি সরূপ মন্ত্রী পরিষদের বাইরে রাখেন। তা রাখলেও তিনি এটা মেনে নিতে পারেননি।

তা না পেরে শেখ হাসিনার ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য চেষ্টা করেন। ভেতরে ভেতরে কাজ করেন। গত সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছেন এর প্রমাণও রয়েছে শেখ হাসিনার কাছে। তিনি ওয়ান ইলেভেনের সময়ে যারা বিরুদ্ধে কাজ করেন তাদের কাউকে মন্ত্রী করতে চাননি। পরে বাধ্য হয়েছেন কাউকে কাউকে নিয়েছেন। যাদরকে নিয়েছেন তার তার জন্য কাল হয়েছেন বলে তার ঘনিষ্ট সূত্র জানায়।

সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা চেয়েছিলেন পদ্মা সেতু প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে। এই জন্য তার কথা মতো সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন নিয়ে কাজ করেন। কাজ দ্রুত এগুতে থাকে ও সেটাতে সাফল্য আসাতে শেখ হাসিনার খুব বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। আস্থার জায়গা তৈরি করেন। যখনই প্রকল্পের কাজ এগুতে থাকে তখনই বিপত্তি ঘটে।

সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু বাস্তবায়ণ করা ও যোগাযোগ খাতে ব্যাপক উন্নতির জন্য তিনি তার বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ট নেতা হিসাবে পরিচিত সৈয়দ আবুল হোসেনকে দায়িত্ব দেন। মূলত : আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ও তাদের কয়েকজন মিডিয়া বন্ধুকে এই জন্য কাজে লাগিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালান। সেই হিসাবে তারা সফল হন।

এদিকে বিশ্বব্যাংকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে এপ্রিলে  চীনে সৈয়দ আবুল হোসেনের দেখা হয়েছে। সেখানে তিনি আবুল হোসেনের কাছে দু:খ প্রকাশ করে বলেছেন আমাদের এখানে নিয়ম হচ্ছে কোনো প্রকল্পের বিষয়ে কোনো ধরনের অভিযোগ এলে সেটার অনুসন্ধান ও তদন্ত করানো। এরপর সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমরাও ঢাকার বিভিন্ন প্রভাবশালী ও অতি পরিচিতজনদের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়েছি। এই কারণেই এটাকে গুরুত্ব দিতে হয়েছে।

কিন্তু বিষয়টি এমন হয়েছে যে আমি দু:খিত। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে আমার কিছুই বলার ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী আমার কাছে সেটি এসেছে স্বাক্ষর করতে হয়েছে। যেখানে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট নিজেও ভুল বুঝতে পেরেছেন। সম্প্রতি চীনের ভাইস প্রেসিডেন্টও পদ্মা প্রকল্প থেকে সরে যাওয়াটাকে দু:খজনক মনে করছে।

বিশ্বব্যাংকের একটি সূত্রে সরকারের কাছে খবর রয়েছে,  আওয়ামী লীগের ভেতরকার কয়েকজন, বিএনপির একটি অংশ এছাড়াও কয়েকজন মিডিয়াব্যক্তিত্বদের পুরো বিষয়টি নিয়ে ষড়যন্ত্র করে। এর প্রেক্ষিতে বিষয়টি ঝুলে যায় ও বিশ্বব্যাংকও পিছিয়ে যায়।

বিশ্বব্যাংক তখন বুঝতে পারেনি যে সরকারের ভেতরেও সরকারের শত্রু রয়েছে। যারা সরকারের ভেতরে কাজ করেছে।  আবুল হোনেকে মন্ত্রী পদ থেকে সরানোর জন্য এত বড় ষড়যন্ত্র করে দেশের ক্ষতি করে। সূত্র জানায়, আবুল হোসেনকে এখন যে দুদক দোষী সাবস্ত্য করতে পারছে না, কানাডার আদালতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ার বিষয়টি বিশ্বব্যাংকও অবগত। এই বিষয়ে খবর নিয়ে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে কানাডার রয়েল পুলিশ যেমন তথ্য দিতে পারেনি। তেমনি দুদকে যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন তারাও কেউ প্রমাণ দিতে পারেননি। আবুল হোসেন নিজেও আÍপক্ষ সমর্থণ করেছেন তার বক্তব্যের মাধ্যমে।

সূত্র জানায়, আবুল হোসেন দুদকের কাছে তার বক্তব্যে সরকারের ও তার বিরুদ্ধে এবং পদ্মা সেতুর প্রকল্প ষড়যন্ত্রের বিষয়টি বলেছেন।

দেশের ও বিদেশের একটি স্বার্থান্বেষী মহলের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ইন্টিগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্সির কতিপয় কর্মকর্তার গোপন যোগাযোগ ও অসত্য তথ্য প্রদানের ফলেই সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। সরকার তথা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ফলেই পদ্মা সেতুর কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

কানাডায় এসএনসি-লাভালিন এর কতিপয় সাবেক কর্মকর্তার নামে যে বিচার প্রক্রিয়া চালু রয়েছে তাতে আবুল হোসেনকে অভিযুক্ত করার কোনো উপাত্ত পাওয়া যায়নি, তাকে কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়নি। কানাডার আদালতের মামলার সঙ্গে দুদকের মামলা সম্পর্কিত নয়। সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, ন্যায় বিচারের স্বার্থে দুদক কর্তৃক দায়েরকৃত মামলা নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংক কর্তৃক পদ্মা সেতু সম্পর্কিত অভিযোগের সঙ্গে আমি কোনো ভাবেই জড়িত নই। আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। দুদক ন্যায়ানুগভাবে তদন্ত করুক। সত্যের সন্ধানে নিবিড় তদন্ত চাই। দুদক গভীরে গিয়ে সত্যের অনুসন্ধানে তদন্ত করলে আমি নির্দোষ প্রমানিত হব ইনশাল্লাহ। আবুল হোসেন এনিয়ে চারবার দুদকের কাছে তার বক্তব্য দেন।

সেখানে বলেন, পদ্মা সেতুর প্রতিটি পর্যায়ে যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অক্ষুণ্ন রেখে কাজ করা হয়েছে। প্রতিটি পদক্ষেপ যে বিশ্বব্যাংকের গাইড লাইন মেনে করা হয়েছে, প্রতিটি কাজে বিশ্বব্যাংকের অনুসমর্থন ছিল-তা প্রমাণসহ উপস্থাপন করেছি, পরামর্শক ও দরদাতা নির্বাচন যে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে করা হয়েছে তা বলেছি। পরামর্শক নিয়োগের ব্যাপারে বলেছেন, পরামর্শক নিয়োগ/বিশেষজ্ঞ কমিটি নিয়োগ, টেন্ডার কমিটি গঠনে ভুমিকা, পরামর্শক নিয়োগে বিলম্বের কারণ, বিভিন্ন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ, আবুল হাসান চৌধুরী ও নিক্সন চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গ, সাকো প্রসঙ্গ, রমেশ শাহের ডাইরি ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেছি। ইতোমধ্যে কানাডার আদালতে পদ্মা সেতু সম্পর্কিত মামলা চালু হয়েছে। তাতে আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, অভিযোগ উত্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

তিনি মিডয়ার কিছু কিছু সাংবাদিক অসত্য সংবাদ পরিবেশন করে সাংবাদিকতার পেশাকে কলুষিত করেছেন দাবি করে বলেছেন,  আমার সারাজীবন সততা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার মাঝে আবর্তিত হয়েছে। এ পর্যন্ত যত ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাকে জড়িয়ে অসত্য সংবাদ ভিত্তিহীন অভিযোগ করা হয়েছে তা ইতোমধ্যে অসত্য প্রমাণিত হয়েছে।

সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন দাবি করেন, পদ্মা সেতু বিষয়ে সামগ্রিক পর্যালোচনায় এটা প্রতীয়মান হয় যে, এদেশের কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহলের অসত্য অভিযোগ, কতিপয় পত্রিকার বাড়াবাড়ি ও বাইরের অপশক্তির প্ররোচণায় প্রভাবিত হয়ে বিশ্বব্যাংক অহেতুক বাংলাদেশের ১টি বড় প্রকল্পে ঋণ প্রদান বাতিল করেছে। এতে বাংলাদেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, বিশ্বব্যাংকও তার মর্যাদা ক্ষুন্ন করেছে।

পাশাপাশি অসত্য অভিযোগ করে আমার ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সুনাম নষ্ট করেছে। তিনি  পদ্মা সেতুর তদন্তের সঙ্গে সঙ্গে দুদকের কাছে পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে যে সমস্ত অসত্য অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়েছে তারও তদন্ত করার দাবি অনুরোধ করেছেন। তিনি দুদকের কাছে বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের ইন্টিগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্সি অফিসে প্রেরিত কিছু বেনামি ই-মেইলের বিষয় সচিব আমাকে মৌখিকভাবে জানিয়েছিলেন।

যেহেতু দরপত্র আহ্বানের সময় দরদাতাদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও বেনামি চিঠি লেখার, অভিযোগ করার রেওয়াজ বাংলাদেশে প্রায়শ:ই পরিলক্ষিত হয়, সেহেতু বিষয়টির প্রতি আমি গুরুত্ব দেইনি। আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত ও বিশেষজ্ঞ কমিটি যেভাবে টেকনিক্যাল বিষয় মূল্যায়ন করেছে আমি তাদের সিদ্ধান্ত ও মূল্যায়নের ওপরই বেশি গুরুত্ব দিয়েছি, কমিটির সদস্যদের মর্যাদাকে সম্মান করেছি।

এক্ষেত্রে আমি তাদের প্রস্তাবের ওপর কোন পরিমার্জন, পরিবর্তন, পরিবর্ধণ, বিয়োজন করিনি বা এ ব্যাপারে কমিটির কোনো সদস্যকে অনুরোধও করিনি।সূত্র:ঢাকাটাইমস

ঢাকা, ২৮ জুলাই, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএইচ