ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরাতে খাদ্যশস্য পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ তাদের নদীপথ ও আশুগঞ্জ বন্দর ভারতকে ব্যবহার করতে দিতে রাজি হয়েছে। ত্রিপুরা সরকার আজ বিবিসির কাছে এ কথা নিশ্চিত করেছেন।

ত্রিপুরার সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী দু-তিন সপ্তাহের মধ্যেই প্রথম দফার 'পরীক্ষামূলকভাবে' দশ হাজার মেট্রিক টন চাল পাঠানোর জন্য দুদেশের মধ্যে সমঝোতা হয়ে গেছে।

এই ‘ট্রায়াল’ সফল হলে আগামী বেশ কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ হয়েই ত্রিপুরায় খাদ্যশস্য আসবে বলে তারা আশা করছেন।
এর আগে ত্রিপুরায় পালাটানায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ভারী সরঞ্জামও এসেছিল আশুগঞ্জ বন্দর হয়েই, তবে চাল-গম পরিবহনের জন্য এই প্রথম বাংলাদেশ তাদের করিডর ব্যবহার করতে দিচ্ছে ভারতকে।

রেলপথ বন্ধ, ভরসা তাই আশুগঞ্জ

ভারতের ত্রিপুরাতে প্রতি মাসে সরকারকে প্রায় ৩৩ হাজার মেট্রিক টন চালগম পাঠাতে হয় – আর এর পুরোটাই প্রায় আসে গৌহাটি-আগরতলা রেলপথ হয়ে, যাকে বলা যেতে পারে ত্রিপুরার ‘লাইফলাইন’।

কিন্তু এই রেলপথের লামডিং-বদরপুর শাখাকে ব্রডগেজে রূপান্তর করার জন্য আগামী অক্টোবর থেকে প্রায় আট মাস ধরে এই রুট বন্ধ থাকবে, কাজেই ত্রিপুরায় খাদ্যশস্য পাঠানোর জন্য ভারতকে খুঁজতে হচ্ছিল বিকল্প পথ।

তবে ত্রিপুরা সরকার আজ বিবিসি বাংলার কাছে এ কথা নিশ্চিত করেছে যে আপাতত তাদের দুশ্চিন্তার অবসান হয়েছে, কারণ ওই রাজ্যে চালগম পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ ভারতকে তাদের করিডর ব্যবহার করতে দিতে রাজি হয়েছে।

"যদিও এটা একটা এককালীন ব্যবস্থা – কিন্তু আমরা আশা করছি, এই পদক্ষেপ সফল হবে এবং বাংলাদেশ সরকারও নিয়মিত ভিত্তিতে আশুগঞ্জ হয়ে ত্রিপুরায় খাদ্যশস্য পাঠাতে দিতে রাজি হবে"

ত্রিপুরার প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি বিজয়কান্তি রায়, যিনি খাদ্য ও গণবন্টন দফতরেরও দায়িত্বে, তিনি জানিয়েছেন যে আশুগঞ্জ বন্দর দিয়ে চাল পাঠানোর জন্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশের মধ্যে ইতিমধ্যেই সমঝোতা হয়ে গেছে।

এই সমঝোতা অনুযায়ী দশ হাজার টন চালের প্রথম চালান জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহের গোড়ার দিকেই আশুগঞ্জ হয়ে আগরতলায় পৌঁছবে।
অন্ধ্রপদেশের কাকিনাড়া বা ভাইজাগ বন্দর থেকে এই চাল রওনা হবে বড় জাহাজে, তারপর কলকাতার কাছে ডায়মন্ড হারবার হয়ে তা বাংলাদেশে ঢুকবে।

তবে বাংলাদেশে ঢোকার আগে অবশ্য বড় জাহাজ থেকে সেই খাদ্যশস্য তোলা হবে ছোট ছোট বাংলাদেশী বার্জে – তারপর আশুগঞ্জ নদীবন্দর থেকে সেই চাল বাংলাদেশী ট্রাকচালকরা পৌঁছে দেবেন আগরতলায়।

বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের পর এবার চালগম

বাংলাদেশের নদীপথ ব্যবহার করে ত্রিপুরায় পণ্য পাঠানোর ঘটনা অবশ্য এটাই প্রথম নয় – এর আগে ২০১২ সালে ত্রিপুরায় পালাটানা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ভারত যাবতীয় ভারী বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছিল এই আশুগঞ্জ হয়েই।

ভারত সরকার স্বীকার করে, বাংলাদেশের ওই সহযোগিতা ছাড়া পালাটানায় বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করাই হয়তো সম্ভব হত না। কারণ সড়কপথে ভারতের দুর্গম উত্তরপূর্বাঞ্চলে ওই সব ভারী সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া শুধু কঠিনই নয়, বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনের তৎপরতার কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণও।

কিন্তু বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির পর বাংলাদেশ যে এবার তাদের ভূখন্ড ব্যবহার করে ভারতের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে চাল-গমও নিয়ে যেতে দিচ্ছে, ভারত তাতে খুবই খুশি।
ত্রিপুরা সরকার তো আশা করছে, এই উদ্যোগ বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের একটা দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার পথ খুলে দেবে।

প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি বিজয়কান্তি রায় বলছিলেন, ‘যদিও এটা একটা এককালীন ব্যবস্থা – কিন্তু আমরা আশা করছি, এই পদক্ষেপ সফল হবে এবং বাংলাদেশ সরকারও নিয়মিত ভিত্তিতে আশুগঞ্জ হয়ে ত্রিপুরায় খাদ্যশস্য পাঠাতে দিতে রাজি হবে।’

তিনি আরও জানান, ‘আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনাও চালাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না-হলেও এই দশহাজার মেট্রিক টন চাল পাঠানোর বিষয়টা অবশ্য পাকা হয়ে গেছে – আর খুব শিগগিরি তা বাস্তবায়িত হয়ে যাবে।’

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রও বলেছেন, অক্টোবর থেকে পরবর্তী আট মাস আশুগঞ্জ হয়েই ত্রিপুরাতে চাল-গম পাঠানো যাবে বলে তারা একরকম নিশ্চিত।

এর জন্য বাংলাদেশে কোনও অবকাঠামো উন্নয়ন বা সংস্কারের প্রয়োজন হলে ভারত তা নিজের খরচেই করে দেবে বলে জানিয়েছে – কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় কোনও ট্রানজিট ফি বা অন্য কোনও মাশুলের লেনদেন হবে কি না, তা নিয়ে অবশ্য ভারত সরকার মুখ খুলতে রাজি হয়নি।সূত্র বিবিসি

ঢাকা, ২৫ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম)//এসএইচ