‘সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী প্রতিদিন এ রাস্তা অতিক্রম করবেন- আমরা বাস্তবে আর স্বপ্নে এ প্রত্যাশাই করি। কারণ, মন্ত্রী এলেই খানা-খন্দকে ঢাকা রাস্তায় সংস্কারের প্রলেপ পড়ে। রাস্তা সংলগ্ন ফুটপাত দখলমুক্ত হয়’।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ওপর সড়ক ও জনপথ বিভাগের বুলডোজার দেখিয়ে এমনটাই বলছিলেন অফিস ফেরত কর্মজীবী নারী সাদিয়া সুলতানা।

তিনি বলেন, মন্ত্রী এতো দৌড়ঝাঁপ করেন। একদিন বেশ পরিবর্তন করে তো গণপরিবহনে উঠতে পারেন! কিংবা কোনো প্রটোকল না নিয়েই আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পারেন সড়কের হাল। তবেই না বুঝতেন, আমরা কতোটা দুর্ভোগ আর কষ্ট নিয়ে নিত্য চলাফেরা করি।

সাদিয়ার এ কথার সঙ্গেই সুমন পাটোয়ারি, হাসান মুন্সীর মতো কর্মজীবিদের আরো অনেকেই দাঁড়িয়ে যান আশ্বিনের বিকেলে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে।

সবাই সমস্বরে বলতে থাকেন, মন্ত্রী এলেই সব সাজানো গোছানো, চকচকে ঝকঝকে! আর চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে আসে আগেকার নিত্য দুর্ভোগ। দখল হয়ে যায় পথচারী চলাচলের ফুটপাত।

কর্মজীবী এসব মানুষের বক্তব্যের মিল পেতে বেশিদূর যেতে হয় না। সড়ক ও জনপথ বিভাগের বুলডোজারের ব্যস্ততাই বলে দেয়, মন্ত্রীর আগমনী বার্তা। আর এ বার্তার জন্যেই যেন সাদিয়াদের মতো কর্মজীবীরা কল্পনা আর বাস্তবে প্রতিদিন মন্ত্রীর উপস্থিতি প্রত্যাশা করেন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সাভারের ব্যস্ততম সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে।

সোমবার দিনভর সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মতৎপরতার সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের চেষ্টায় সাভার বাসস্ট্যান্ড এখন যানজটমুক্ত। বুলডোজারের আঁচড়ে মুক্ত হয়েছে ফুটপাত। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। উচ্ছেদ করা হয়েছে অবৈধ মাছের বাজার।

মঙ্গলবার সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে সিটি সেন্টারের সামনে নির্মিত দ্বিতীয় ফুটওভার ব্রীজ উদ্বোধনের কথা রয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপির।

আর সেই ফুটওভার ব্রিজের দুই পাশেই হকার্স লীগের সৌজন্যে মন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে ঝুলছে বিশাল আকৃতির ব্যানার।

কলেজ ছাত্র রবিউল ইসলাম ব্যানারটি দেখিয়ে বললেন, যারা ফুটপাত দখল করে আমাদের চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করে রাখেন তারাই বিশাল ব্যানার টাঙিয়ে স্বাগত জানাচ্ছেন মন্ত্রীকে।

এ কারণেই তো দেশে আসলে কাজের কাজ কিছুই হয় না। হবেই বা কি করে!শেয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দিয়ে মুরগি চেয়ে যা হয় তাই হবে এখানে, বাংলানিউজের কাছে এভাবেই নিজের ক্ষেদোক্তি প্রকাশ করেন অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক ইব্রাহিম খলিল।

ঢাকা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আতাউর রহমান জানান, আমরা সড়ক পরিচ্ছন্ন করতে চাই। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে চাই। ফুটওভার ব্রিজ উদ্বোধনকে ঘিরে আমরা বাজার বাসস্ট্যান্ডকে পরিচ্ছন্ন করছি। দখলমুক্ত করেছি।

কিন্তু কতোদিন এ পরিস্থিতি বজায় থাকবে- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, কেবলমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর প্রশাসনিক তদারকি হলেই এটা সম্ভব।

সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কাজের তদারকিতে ছিলেন সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল হাসান মোল্যা।

তিনি বলেন, সদ্য নির্মিত ফুটওভার ব্রিজ ঘিরে ৬০টির মতো ছোট-বড় অবৈধ স্থাপনা আমরা উচ্ছেদ করেছি।

বাজারের ব্যবসায়ীদের বলে দিয়েছি এ পরিস্থিতি বজায় রাখতে। নইলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুশিয়ার করা হয়েছে তাদের।

বুলডোজারের আঘাতে অর্ধশতাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর রুটি রুজিতে আচঁড় লেগেছে। বিষয়টি অমানবিক। তবে তাদের কাছে যারা এই ফুটপাত অবৈধভাবে ইজারা দেন তারা কিন্তু থেকেছেন পর্দার বাইরে। হয়তো পর্দার বাইরে থাকা এসব লোকরাই থাকবেন মন্ত্রীকে ঘিরে। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত করবেন মন্ত্রীর উদ্বোধনস্থল।

আর এ দৃশ্যই চলবে দিনের পর দিন। মন্ত্রী চলে যাওয়ার পর ফিরে যাবে চিরচেনা বাজার বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাত দখল আর ময়লা আবর্জনার জঞ্জাল- এমনটাই আক্ষেপ করছিলেন সোহরাব হোসেন নামের নাগরিক কমিটির এক নেতা।

ঢাকা, ২৯ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, জেআই