রংপুরে গত এক বছরে বেশ কিছু আলোচিত ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- অবরোধের নামে বাসে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে ছয় যাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা। জাপানি নাগরিক, মাজারের খাদেম ও সাংবাদিককে কুপিয়ে হত্যাও অন্যতম। বিষাক্ত মদ পানে ১০ জনের মৃত্যুসহ দৈনিক যুগের আলোর স্টাফ রিপোর্টার উৎস রহমানকে কুপিয়ে হত্যাও রংপুরবাসীর মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

১৪ জানুয়ারি ২০১৫। রংপুরের মিঠাপুকুরে ঢাকাগামী যাত্রীবাহী বাসে দুর্বৃত্তরা পেট্রোল বোমা ছুড়ে পুড়িয়ে মেরেছে নারী-শিশুসহ ছয়জনকে। ঘটনাস্থলে চারজন এবং রমেক হাসপাতালে আরো দুজন মারা যায়। এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে রাত ১টায় কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকাগামী বাসে। এ সময় আরো ২২ যাত্রী অগ্নিদগ্ধ হন।

২১ মার্চ রংপুর মহানগরীর দেওডোবা এলাকায় আয়শা সিদ্দিকা সুমাইয়া (১২) শিশুকে হত্যা করা হয়। সে রংপুর নগরীর জাহেদা খাতুন গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

বছরের শুরুতে তিন মাস বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় সমন্বয় পরিষদের ব্যানারে শিক্ষক সমিতি আন্দোলন করে ভিসির অপসারণের দাবিতে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক সব ভবনে তালা ঝুলিয়ে শিক্ষাসহ সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। পরে ভিসি জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারকে প্রশাসনিক সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২২ মার্চ ম্যাজিস্ট্রেট মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক পুলিশ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর শাহীনুর রহমান প্রশাসনিক ভবনের তিনটি গেটের এবং একাডেমিক চারটি ভবনের ১২টি গেটের তালা ভেঙে দিলে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হয়।

২২ এপ্রিল রংপুরে স্কুলছাত্রী মাসুদা আক্তার মনিষাকে এসিড মারার ঘটনায় এক বখাটের ফাঁসি এবং দুজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। রংপুরের জেলা ও দায়রা জজ মঞ্জুরুল বাছিদ এ রায় দেন। এই রায়টি সে সময় সারা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল।

মাসুদা আক্তার মনিষা রংপুর নগরীর দক্ষিণ বাবুখাঁ এলাকার মহুবুল ইসলাম ও সুলেখা পারভীনের মেয়ে। রংপুর সমাজকল্যাণ বিদ্যাবিথি মহাবিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিল মনিষা।

১৫ এপ্রিল রংপুর মেডিক্যাল কলেজে আধিপত্য বিস্তার ও নববর্ষের অনুষ্ঠান পালন করা নিয়ে কলেজের মুক্তা ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগের দুগ্রুপের সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হয়। এ ঘটনায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।

৭ মে রংপুরে শিশু হত্যার অভিযোগে মাজেদা বেগম নামে এক নারীকে ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার ঠাকুরদহ মন্দিরাপাড়া গ্রামের শামসুল হকের স্ত্রী মাজেদা বেগম ২০০৭ সালের ২৩ জুলাই পাশের বাড়ির আবদুল মান্নানের ছয় বছরের ছেলে রুম্মানকে গলা টিপে হত্যা করা হয়।

১ জুন রামনাথপুর ইউনিয়নের ডাঙ্গিরপাড় এলাকার মিজানুর রহমান তার স্ত্রী আরিফা বেগমকে গলা কেটে হত্যা করে।

৩০ সেপ্টেম্বর রংপুরের মাহিগঞ্জ এলাকায় বিষাক্ত মদপানে কমপক্ষে ১০ জন মারা যায়। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলাসহ ৯টি মামলা হয়েছে। পুলিশ সে সময় অভিযান চালিয়ে ৪৫ জনকে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় মাহিগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আবদুল আজিজসহ দুজনকে পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়।

২২ সেপ্টেম্বর চাঞ্চল্যকর মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সাতজনের একটি চক্রকে রংপুরে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তিনজন ডাক্তার, কোচিং সেন্টারের তিনজন শিক্ষক ও একজন পরিচালক রয়েছে। পরে তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার করা হয়।

গত ৩ অক্টোবর রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোসিকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নগরীর আলুটারি এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। পুলিশ এ ঘটনায় প্রথমে সন্দেহভাজন পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। পরে গ্রেফতরকৃত জেএমবি কমান্ডার মাসুদ রানাসহ আরো কয়েকজন জেএমবি সদস্য আদালতে কুনিও হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়।

৮ নভেম্বর রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) বাহাই সম্প্রদায়ের নেতা রুহুল আমিনকে দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালায়। এ ঘটনাও ঘটিয়েছে জেএমবি।
১০ নভেম্বর কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মাজারের খাদেম রহমত আলীকে চৈতার মোড়ে দুর্বৃত্তরা এলাপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনারও দায় স্বীকার করেছে জেএমবি।

২৬ নভেম্বর রংপুরের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ১০ ব্যাপ্টিস্ট চার্চের যাজককে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। হুমকিতে বলা হয়, ‘খ্রিষ্টানের নেতাগণ তোমরা যা খাবার ইচ্ছা করে তা খেয়ে নাও, এই মুহূর্ত থেকে জেনে রাখবা আগামী যে কোন দিন, সময় বা মুহূর্তে তোমাদের বিদায় দেব।’ এ নিয়ে প্রশাসনসহ সর্বত্রই ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছিল।

২৩ ডিসেম্বর ভোরে রংপুরের স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক যুগের আলোর স্টাফ রিপোর্টার মসিউর রহমান উৎসকে নগরীর অদূরে ধর্মদাশ এলাকায় দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করে। এ নিয়ে সাংবাদিক সমাজ আন্দোলনে সোচ্চার রয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেফতার করলেও মামলার তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

উৎসকে হত্যা করে তার মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোন, ক্যামেরা দুর্বৃত্তরা নিয়ে যায়। ঘটনার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পুলিশ খোয়া যাওয়া কিছুই উদ্ধার করতে পারেনি।

এ রকম বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা ২০১৫ সাল জুড়ে রংপুরবাসীকে নাড়া দিয়েছে।

এমএম