বাংলাদেশের সবুজ গালিচায় শুয়ে আছেন বাঙালির গর্ব বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান। মঙ্গলবার তার ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। একাত্তর সালের এই দিনে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্তের চৌকিতে তিনি শহীদ হন।
১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারী হামিদুর রহমান ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। তার বাবার নাম আক্কাস আলী ও মায়ের নাম কায়সুননেছা ।
১৯৭১সালের ২ ফেব্রুয়ারী ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে (বর্তমানে বাংলাদেশ আনসার) সৈনিক হিসেবে যোগ দান করেন। বেশি দিন চাকরি করতে পারলেন না তিনি, শহীদ হলেন দেশ মাতৃকার জন্য।
১৯৭১ সালে হামিদুর রহমান মৌলভিবাজারের শ্রীমঙ্গলের ঢালাই সীমান্ত ক্যাম্পে কর্তব্যরত ছিলেন।
২৮ অক্টোবর ১৯৭১ যখন "ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট" এবং "৩০ এ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্ট" এর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয় তখন হামিদুর রহমান গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন এবং এ যুদ্ধে শহীদ হোন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ১১টি সেক্টরের মধ্যে ৪ নম্বর সেক্টরের মেজর (পরে মেজর জেনারেল) সি আর দত্তের অধীনে ছিল ভারতের ত্রিপুরার কমলপুর সাব-সেক্টর। এ সাব-সেক্টররের অধিনায়ক ছিলেন কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগরের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অব.) সাজ্জাদুর রহমান।
স্মৃতিচারণে ক্যাপ্টেন (অব.) সাজ্জাদুর রহমান জানান, ২৪ অক্টোবর ১৯৭১ সালের ভোর থেকে ২৮ অক্টোবর ভোর পর্যন্ত কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্তে ইপিআর (বর্তমান বিজিবি) ফাঁড়ির সম্মুখে পাক সেনাবাহিনীর সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়।
এ সময় ধলই সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধাদের এই প্লাটুনের অ্যাসল্ট অফিসার ছিলেন মেজর (অব.) কাইয়ুম চৌধুরী। আর সিপাহী হামিদুর ছিলেন কাইয়ুম চৌধুরীর রানার। টানা চার দিনেও পাকিস্তানী বাহিনীকে যখন পিছু হটাতে পারছিলেন না মুক্তিযোদ্ধারা।
তখন মেজর এক বৈঠক ডাকেন।তখন সিদ্ধান্ত হয় পাকিস্তানীদের উপর গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাদের পিছু হটাতে হবে। এসময় সিপাহি ছিল মোঠ ১২৫ জন। এ সময় হামিদুর রহমান সিদ্ধান্ত নেন তিনিই এ দায়িত্ব নিবেন।
এরপর সিপাহী হামিদুর ২৮ অক্টোবর ঘন কুয়াশা ও প্রবল গুলিবর্ষণের মধ্যে প্রায় আধাকিলোমিটার গ্রেনেড হাতে করে ধলই ইপিআর ক্যাম্পে পৌঁছে পাকিস্তানী বাংকারের উপরে ছুড়ে মারেন।
গ্রেনেডের তেজস্ক্রিয়তায় বাংকার উড়ে যাওয়ার পর পাকিস্তানী সেনাদের একটি গুলি পেছন দিক থেকে এসে শরীরে লাগলে হামিদুর রহমান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সহযোগী মুক্তিযোদ্ধারা হামিদুর রহমানের লাশ উদ্ধার করে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২৫-৩০ কিলোমিটার দূরে ভারতের অভ্যন্তরে ত্রিপুরার আমবাসায় নিয়ে তাকে দাফন করেন।
বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের জন্য মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্তে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিসৌধ। স্মৃতিস্তম্ভটির তিনদিকেই চা-গাছ, সারি সারি বৃক্ষরাজির সমাহার।
স্মৃতিসৌধের সম্মুখে ১৯৯২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ১৭ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সৌজন্যে একটি বীরশ্রেষ্ঠ সরণিও নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এখানে সীমান্ত যাত্রী অবকাশ নামে একটি সুদৃশ্য ছাউনি রয়েছে।
জোট সরকারের আমলে তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমান হামিদুর রহমানের শহীদ হওয়ায় স্থানে ২০০৩ সালের ৩০ এপ্রিল স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে ওই স্থানে স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়।
ভারত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘ যোগাযোগের পর হামিদুর রহমানের লাশ দেশে এসেছিল। সরকারি উদ্যোগে কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে তার লাশ দেশে এনে ঢাকায় বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছে।
ধলই সীমান্তটি কমলগঞ্জ উপজেলাধীন। কিন্তু ভুল করে লেখা বা বলা হয় শ্রীমঙ্গল উপজেলাধীন। তাই এই বীরের ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সুধীমহল তার স্মৃতিসৌধ এলাকায় একটি জাদুঘর, একটি বিশ্রামাগার ও পাঠ্যপুস্তকে উল্লিখিত ভুল সংশোধন করার দাবি জানান।
ইআর





