''ডেঙ্গু'' সরকারি হিসাব মতে, প্রতি আড়াই মিনিট অন্তর একজন ভর্তি করা হচ্ছে হাসপাতালে। মিনিটে মিনিটে ডেঙ্গু রোগী আসছে হাসপাতালগুলোতে।
তবে ডেঙ্গুর সংক্রমন নিয়ে অনেক রোগীই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন না। আবার কেউ কেউ হাসপাতালে সিট না পেয়ে বাসায় চলে যাচ্ছেন।
সরকারি চাকরিজীবী শাখাওয়াত হোসেন। তিনি সমকালকে জানান, প্রথমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে সেখানে কোনো শয্যা ফাঁকা না থাকার কথা জানানো হয়।
এরপর একে একে তিনি ধানমণ্ডির ইবনে সিনা, স্কয়ার, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তির জন্য নিয়ে গেলেও সেখানে শয্যা ফাঁকা পাওয়া যায়নি।
সরকারি হিসাবে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৫৬০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি জুলাই মাসেই আক্রান্ত হয়েছে ৬ হাজার ৪২১ জন। আর এবছর আক্রান্তের সংখ্যা ৮ হাজার ৫৬৫ জন। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মারা যাওয়ার হিসাব আটজন দিলেও বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা অন্তত ২৮ ছাড়িয়ে যাবে। বেসরকারি হিসাবে আক্রান্তের সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেশি হবে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
ঢাকার বাইর থেকে ১৭৯ জন আক্রান্তের খবর দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এদিকে, ডেঙ্গু ক্রমেই ভয়ঙ্কর রূপ নেয়ায় জ্বর হলে ডেঙ্গু আতঙ্ক নিয়ে হাসপাতালে ছুটছেন রোগীরা। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ঠাঁই মিলছে না অনেক রোগীর।
রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার বাসিন্দা কেফায়েত উল্লাহর ছেলে আনোয়ারুল আজিম এবং মেয়ে নোভা দু'জনেই জ্বরে আক্রান্ত। গতকাল বুধবার আদ্-দ্বীন, সেন্ট্রাল হাসপাতাল, গ্রিন লাইফে ঘোরাঘুরি করেও ভর্তি করাতে পারেননি। কর্তৃপক্ষ বলছে সিট ফাঁকা নেই। পরে রাজধানীর পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে দুই ছেলেমেয়েকে ভর্তি করান। বর্তমানে তারা সেখানে চিকিৎসাধীন।
মগবাজার এলাকার প্রাইভেটকার চালক আলমগীর হোসেনের দুই ছেলে নাহিদ ও নাফিজ জ্বরে আক্রান্ত। গত মঙ্গলবার তাদের ঢাকা শিশু হাসপাতালে নিয়ে গেলে পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। কিন্তু হাসপাতালে কোনো শয্যাই ফাঁকা ছিল না।
অনেক তদবির করে অন্য ওয়ার্ডে নাহিদের ভর্তির ব্যবস্থা করেন। কিন্তু নাফিজকে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি। আলমগীর ও তার স্ত্রী নাহিদের শয্যার পাশেই নাফিজকে কোলে নিয়ে বসে থাকেন। হাসপাতালে কোনো শয্যা ফাঁকা না থাকায় তাকে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি।
সেন্ট্রাল হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. এ কে এম মোজাহার হোসেন জানান, হাসপাতালে শয্যার তুলনায় রোগীর ভিড় অনেক বেশি। সবাইকে ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। নির্ধারিত শয্যার বাইরেও ডেঙ্গু আক্রান্তদের ভর্তি করে চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ জন্য অনেক রোগী ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছি।
পরিস্থিতি মহামারী আকার ধারণ করেছে বলে মনে করছেন হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এল ই ফাতমী। ডা. এল ই ফাতমী আরও বলেন, এবার শুধু সংখ্যায়ই বেশি না। এবার প্রায় সবাই ডেঙ্গু হেমারজিক ফিভারে আক্রান্ত। আগে ছিল ক্লাসিকাল ডেঙ্গু রোগী। এদের পঞ্চাশ ভাগেরই শক সিন্ড্রোম। শক সিন্ড্রোম অর্থ হচ্ছে পালর্স (নাড়ির গতি) পাওয়া যায় না। এবার ডেঙ্গুর প্যাটার্নটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এদের সবার প্ল্যাটিলেট কমে যাচ্ছে, সবাই শকে চলে যাচ্ছে। আগে সামান্য ডেঙ্গু হয়েই ভালো হয়ে যেত। এবার সবারই রক্ত লাগছে। পেটে ও ফুসফুসে পানি চলে আসে। এই পরিস্থিতিতে জ্বর হলে গাফিলতি না করার পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।
তিনি জানান, তাদের হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে যে রোগী আসছে তার ৮০ শতাংশই শিশু। এদিকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে বর্ণনা করেছে।
বিএমএর সচেতনতামূলক কার্যক্রম : চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে গতকাল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে 'ডেঙ্গুজ্বরের যথোপযুক্ত চিকিৎসা, নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ' শীর্ষক এক বৈজ্ঞানিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। পরে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হয়।
সংগঠনের সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। মূূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ। অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আতিকুল হক, অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।
আগের সব রেকর্ড ভেঙে গেল ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ৫৬০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। আর এ বছর ডেঙ্গুতে ৮ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি।
এএস





