যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে চলছে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বই মেলা। স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের পিএস-৬৯ মিলনায়তনে ফিতা কেটে এই উৎসবের উদ্বোধন করেন বিশ্বসসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। এ সময় বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু লেয়ার লেভিনসহ বাংলাদেশ ও কলকাতার লেখক সাহিত্যিকরা উপস্থিত ছিলেন।

নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের ডাইভার্সিটি প্লাজা থেকে বর্ণ্যাঢ্য শোভা যাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয় আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বই মেলার আনুষ্ঠানিকতা। শোভা যাত্রাটি কয়েকটি সড়ক প্রদক্ষিণ করে জ্যাকসন হাইটসের পিএস -৬৯ এ মেলার মূল যায়গায় এসে পৌছে। এরপর আনুষ্ঠানিক ফিতা কেটে মেলার উদ্বোধন করেন শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ আবু সাইদ।

উদ্বোধনের পরই মঞ্চে ২৪টি মঙ্গল প্রদীপ জ্বেলে বইমেলা ও আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসবের উদ্বাধনী অনুষ্ঠানের সূচনা করেন অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, বইমেলার আহবায়ক ও ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধান রোকেয়া হায়দার, বিশিষ্ট নাট্যকার রামেন্দু মজুমদার, বিশ্বভারতীর পরিচালক রাম কুমার মুখোপাধ্যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নববিক্রম কিমোর ত্রিপুরা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিজ্ঞানী ও নিউজার্সির প্লেইন্সবরোর কাউন্সলম্যান ড. নূরন নবী, নিউইয়র্কের কনসাল জেনারেল মো. শামীম আহসান, প্রকাশক আমিনুল ইসলাম, আহমেদ মাজহার, হুমায়ুন কবীর ঢালি, সাংবাদিক আহমেদ মুসা, বিশিষ্ট ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন, বীর প্রকাশ পাল, হাসান ফেরদৌস, জার্মান প্রবাসী লেখিকা নাজমুন নেসা পিয়ারি, বিশিষ্ট লেখিকা শারমিন আহমেদ, সম্মুদাস গুপ্ত, নজরুল ইসলাম, সাংবাদিক মনজুর আহমদ, লেখক ফেরদৌস সাজেদীন প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে সবার দৃষ্টি ছিল বাংলাদেশের বন্ধু লেয়ার লেভিনের দিকে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে গিয়েছিলেন লেয়ার লেভিন। তার ক্যামেরায় বন্দি করেছিলেন দুর্লভ অনেক চিত্র। যে চিত্র দিয়ে পরে প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ তৈরি করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘মুক্তির গান।’

লেয়ার লেভিনের কাছ থেকেই সেই দুর্লভ চিত্রগুলো সংগ্রহ করেছিলেন। লেভিন নিজেও জানালেন সেই কথা। তাকে ২৪তম বই মেলা এবং আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসবের প্রথম দিনেই সম্মাননা জানানো হয়। তাকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. শামীম আহসান।

সম্মাননা অনুষ্ঠানে লেয়ার লেভিন আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আমি এই চিত্র দিয়ে ‘জয় বাংলা’ চলচ্চিত্র তৈরির চিন্তা করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার তা করতে পারিনি। তারেক মাসুদ এবং ক্যাথরিন মাসুদ আমার কাছে আসলে আমি তাদের তা নিঃশর্তে তুলে দিই।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ অনেক সুন্দর দেশ। বাংলাদেশের মানুষ ও তাদের সংস্কৃতিও সুন্দর।

তিনি বলেন, আমি যখন চিত্রগ্রহণ করছিলাম, সেই সময় আমাকে আমেরিকান স্পাই বলে গ্রেফতার করা হয়, আমেরিকায় পাঠিয়েও দেয়া হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, নিউইয়র্কে দুই যুগ বাংলা বইমেলা হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব হচ্ছে এটা কম কথা নয়। আগামী বছর ২৫ বছর পূর্ণ হবে। রজতজয়ন্তীতে আরো বড় অনুষ্ঠান হবে।

বইয়ের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বই বিরোধী। বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ক হয় শুধুমাত্র পরীক্ষার সময়। তিনি আরো বলেন, বর্তমান পৃথিবী জ্ঞানের চেয়ে তথ্যকে বেশী গুরুত্ব দেয়। কারণ এটি ব্যবসার যুগ। কিন্তু মানুষের প্রেম, ভালবাসা, মূল্যবোধেরও গুরুত্ব রয়েছে।

এবারের বইমেলার আহবায়ক রোকেয়া হায়দার স্বাগত বক্তব্যে বই মেলায় আগত সকল অতিথিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আগামী তিন দিন আমরা উৎসবে মেতে থাকবো। আপনারা যা বলবেন আমরা তা শুনবো, আর আমরা যা বলবো তা আপনারা শুনবেন।

তিনি বলেন, বইমেলা এবং আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি এবং বিশ্ব বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে।

আলোচনা শেষে সাংস্কৃতিক পর্ব শুরু হয় সঙ্গীত পরিষদের উদ্বোধনী সঙ্গীত এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি শিল্পীদের নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে। জজ হ্যারিসনের সঙ্গীত দিয়েই নতুন প্রজন্মের শিল্পী দ্বিতীয় ফেরদৌস, দীপাঞ্জলি ভৌমিক, বাসমা, শ্রুতিকনা দাসের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয় কনসার্ট ফর বাংলাদেশ।

অনুষ্ঠানে যশোর রোড কবিতা আবৃত্তি করে ও সৌরভ সরকার। আরো সঙ্গীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশ থেকে আগত শিল্পী মেহরুন আহমেদ, মারিয়া ও স্থানীয় শিল্পী পার্থ সারথি মুখোপাধ্যায়। এর আগে উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন কাবেরী দাশের পরিচালনায় নিউইয়র্কের সঙ্গীত পরিষদের শিল্পীরা।

পুরো অনুষ্ঠানের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা। যৌথ উপস্থাপনায় ছিলেন ডানা ইসলাম, ক্লারা রোজারিও, সাবিনা হাই উর্বি, মিহির চৌধুরী। মঞ্চ ব্যবস্থাপনা, অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন নিনি ওয়াহেদ ও সেমন্তী ওয়াহেদ।

আইএ/ এআর