বাংলাদেশ ব্যাংকের (বিবি) রিজার্ভ হ্যাকের ঘটনাকে চুরির ঘটনা বলে অভিহিত করা তথ্য প্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহাকে আরখুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। থানার দ্বারে দ্বারে ঘুরেও পুলিশের কাছে গিয়েও সহযোগিতা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেছে পরিবার।
তানভীরের পরিবার জানিয়েছে, গত বুধবার মধ্যরাত থেকে তার কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না তারা। জোহার স্ত্রী ডা. কামরুন নাহার গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বলেন, গতকাল (বুধবার) রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছে। তখন বলেছিল, বাসায় ফিরছে। কিন্তু রাত ১২টার পর থেকে মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।ইয়ামিন নামে তানভীরের এক বন্ধু জানিয়েছেন, তাকেসহ তানভীরকে অজ্ঞাত পরিচয়ের ব্যক্তিরা তুলে নিয়েছিল। পরে তাকে ছেড়ে দিলেও তানভীরকে নিয়ে চলে যায়।
জোহার পরিচিতরা জানান, বুধবার (১৬ মার্চ) অফিস থেকে বাসায় ফেরার সময় রাত ১২টার দিকে স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা হয় তার। এর আগে দুদিন তিনি বাসায় ফেরেননি। অফিস থেকে বের হওয়ার পর সিএনজিতে ওঠেন জোহা। কচুক্ষেত এলাকায় দুই-তিনটি গাড়ি তার সিএনজিকে ঘিরে ধরে। এরপরই অপহৃত হন তিনি।
তানভীরের চাচা বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক মহাপরিচালক মাহবুবুল আলম বলেন, রাত ২টার দিকে ইয়ামিন এসে বলে, তানভীর তাকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ডেকে নিয়েছিল। পরে তারা একসাথে বাসায় ফেরার জন্য একটি সিএনজি অটোরিকশায় ওঠে। হঠাৎ করেই এটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপরই একটি জিপ তাদের সামনে এসে থামে এবং কিছু না বলার আগে দুজনকে আলাদা করে ফেলে। এরপরেই ইয়ামিনকে একটি গাড়িতে করে মানিক মিয়া এভিনিউ এলাকায় নামিয়ে দেয়া হয়।
ইয়ামিনের কাছে খবরটি প্রথমে কলাবাগান থানায় যান তানভীরের পরিবারের সদস্যরা। তাদের এলাকা নয় বলে তাদের কাফরুল থানায় যেতে বলা হয়। সেখানে গেলে তারা ক্যান্টনমেন্ট থানায় যেতে বলে। সেখানে গেলে তারা বলে আবার কাফরুল থানায় যেতে। কাফরুলে আবার গেলে তারা বলে, এলাকাটি ভাষানটেক থানা এলাকায়। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত পুলিশের সাহায্য না পেয়ে হতাশ হয়ে ভাষানটেক থানায় আর যাইনি, বলেন মাহবুবুল আলম।
কামরুন নাহার বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন জায়গায় বলা হলেও কেউ তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি।
কাফরুল থানার ওসি শিকদার মো. শামীম হোসেন বলেন, “ওরা মৌখিকভাবে আমাদের বলার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখেছি, এটা ভাষানটেক থানা এলাকায় পড়েছে। তাদের ওই থানায় যেতে পরামর্শ দেয়া হয়।”
ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, তাদের কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি।
ভাষানটেক থানার ওসি নজরুল ইসলাম বলেন, কাফরুল থানার ওসি এ ব্যাপারে আমাকে ফোন করেছিলেন। তবে অপহরণ সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে কেউ থানায় আসেনি। কেউ এলে আমরা ঘটনাস্থল যাচাই করে বলতে পারব যে কোন থানায় পড়েছে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নিখোঁজ হওয়ার তিনদিন আগে তিনি এক সাক্ষাৎকারে একাধিক গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরির আসল ঘটনা আমি সংবাদ মাধ্যমকে বলেছি, এ কারণে আমাকে চাপ দেয়া হচ্ছে। আমাকে হুমকি দেয়া হচ্ছে। আমি প্রধানমন্ত্রীকে পুরো ঘটনা জানাতে চাই।
জোহাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়ে গেছে কি না, জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল গতকাল বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে বলেছেন, জোহাকে যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনও দল নিয়ে থাকে, তাহলে তাকে আদালতেই সোপর্দ করা হবে।
জোহার স্ত্রী ডা. কামরুন নাহার সাংবাদিকদের কাছে তার স্বামীর সন্ধানের দাবি জানিয়ে বলেছেন, জোহা সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থেকে দেশের জন্য কাজ করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার কাছে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে যখনই কোনও সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে, তখনই সে তাদের সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছে।
জোহা যাতে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারেন, সেজন্য তিনি প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন।
সরকারের আইসিটি বিভাগের সাইবার সিকিউরিটি ফোকাল পয়েন্টের কর্মকর্তা পরিচয়ে সম্প্রতি রিজার্ভ চুরির তদন্তের নানা বিষয়ে তানভীর জোহা গণমাধ্যমে কথা বলছিলেন। এরপর আইসিটি বিভাগ থেকে জানানো হয়, তানভীর জোহার সঙ্গে বিভাগের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই। তখন তানভীর গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, তিনি আগে এই বিভাগের কাজে যুক্ত ছিলেন।
এ দিকে, রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় তদন্তকারী সংস্থা সিআইডির একটি প্রতিনিধি দল গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক ২য় দিনের মতো পরিদর্শন করেন। এরপরই সিআইডির উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, এই ঘটনার তদন্তে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের বাংলাদেশ কার্যালয়ের কর্মকর্তার সঙ্গে আজ শুক্রবার আলোচনায় বসবে এ মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ ছাড়া ইন্টারপোলের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করবে তদন্ত সংস্থাটি।
তানভীর বলেছিলেন, হ্যাকিংয়ে মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ লোপাটের ঘটনায় একটি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ‘ছায়া তদন্তকারী’ হিসেবে কাজ করছেন তিনি। তবে ওই গোয়েন্দা সংস্থার নাম প্রকাশ করেননি তিনি। কোনো সংস্থার পক্ষ থেকেও বলা হয়নি যে তানভীর তাদের সঙ্গে কাজ করছেন।
তানভির হাসান জোহা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) মন্ত্রণালয়ের সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের ডিরেক্টর (অপারেশন)। তবে এই প্রকল্পটি গত দুই মাস ধরে স্থগিত আছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিভার্জ থেকে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ডলার সরিয়ে নেয়ার ঘটনায় তদন্তের কাজে তাকে নেয়া হয়।
'তানভির হাসান জোহা তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কেউ নয়'টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এমন এক বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতেই ১৪ মার্চ একাধিক গণমাধ্যম তার বক্তব্য জানতে চায়। তখন জোহা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা নিয়ে তদন্তকারীরা কেউ কথা বলেননি। আমি বলেছি। আমি আমার দায়িত্ব থেকেই বলেছি। এটা প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরি নিয়ে প্রকৃত তথ্য সংবাদ মাধ্যমের কাছে প্রকাশ করায় একটি মহল আমার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছে। তাই তারা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। তারা তদন্ত সহায়তা থেকে আমাকে সরিয়ে দিতে চাইছেন। কারণ, আমি অনেক বিষয়েই প্রশ্ন তুলছি।
জোহা আরও বলেন, আমি বিদেশী নাগরিকদের তদন্তে রাখা নিয়ে আপত্তি করেছি। কারণ, আমি মনে করি, হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি হোল (গর্ত) তৈরি করেছেন, আর এখন বিদেশী বিশেষজ্ঞদের হাতে তদন্তের নামে তথ্য তুলে দিলে আরও বড় হোল তৈরি হবে। আমি পুরো বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকেও জানাতে চাই।
এমআইএস।





