‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) আন্দোলনের চেয়ারম্যান ও চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেছেন, শিক্ষার্থীদের দাবি বাস্তবায়নের কাজ রোববার থেকে যদি শুরু না হয় তাহলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমি নিজেও আন্দোলনে রাস্তায় নামবো।

সড়ক দুর্ঘটনারোধে কার্যকর পদক্ষেপ ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আজ (শুক্রবার) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনের আয়োজন করে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) নামের সংগঠনটি। সকাল সোয়া ১১টার দিকে ইলিয়াস কাঞ্চন আনুষ্ঠানিকভাবে মানববন্ধন শুরু করেন। তবে এর আগে সকাল ১০টা থেকেই বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে মানববন্ধনে যোগ দেন।

মানববন্ধনে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, “শিক্ষার্থীদের দাবি বাস্তবায়নের কাজ আগামী রবিবার (৫ আগস্ট) থেকে শুরু করতে হবে। যদি এটা না হয় তাহলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমি নিজেও আন্দোলনে থাকবো এবং রাস্তায় নামবো।”

সম্প্রতি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পায়েলের মৃত্যু এবং ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলা বাসস্ট্যান্ডে বাস চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার প্রতিবাদে এই মানববন্ধনের ডাক দেন ইলিয়াস কাঞ্চন।

তিনি দলমত নির্বিশেষে সবাইকে দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে মানববন্ধনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দায়িত্বহীন বক্তব্যেরও তীব্র প্রতিবাদ জানান তিনি।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, “সম্প্রতি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পায়েলের মৃত্যু ও ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলা বাসস্ট্যান্ডে বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা সারাদেশের মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা দেশের সড়ককে নিরাপদ করার লক্ষ্যে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে মাঠেই রয়েছি এবং মাঠে থাকবো যতদিন না নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন হয়।”

বেলা ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত টানা এক ঘণ্টা মানববন্ধন ও সমাবেশ চলে। তবে সকাল ১০টা থেকেই বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তার দুই পাশ বন্ধ করে সমাবেশ ও মানববন্ধন করেন।

১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন। এরপর তিনি নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। গড়ে তোলেন সংগঠন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে বৃহস্পতিবার (০২ জুলাই) বিকেলে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, “টকশোসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আমি এই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পক্ষে কথা বলছি। কাজ করার ক্ষেত্রে প্রত্যেকের একটা নিজস্ব কৌশল আছে। সেই টেকনিকে কাজ করতে হয়। অতীতের কিছু ঘটনা মনে রেখে পদক্ষেপ নিতে হয়।”

তিনি বলেন, “আপনাকে মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে গণজাগরণ মঞ্চ হয়েছিল। লোকের অভাব হয়নি। কিন্তু সেটা কীভাবে ট্যাকেল হয়েছে আপনাদের মনে আছে। ইমরানের নামগন্ধও কিন্তু এখন নেই।” 

“কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী বললেন, কোটা যেহেতু ছেলেরা চায় না, তাই কোটা রাখব না। এরপর জানেন আপনি কী হয়েছে। এগুলো মাথায় নিয়েই কিন্তু কাজ করতে হবে।”

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, “২৫ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছি। আমি যদি বাচ্চাদের সঙ্গে থাকি, তবে এখানে কিছু হলে টোটাল দোষটা কিন্তু আমার ওপর আসবে। আমি যদি মাঠে এদের পাশে থাকতাম তবে বলা হত গাড়ি ভাঙচুরের জন্য এই লোকটিই উসকে দিয়েছে।”

আগামীকাল (শুক্রবার) তার সংগঠনের পক্ষ থেকে মানববন্ধন করা হবে জানিয়ে কাঞ্চন বলেন, “আমি সেখানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলব। তাদের কী করা উচিত- তারা যাতে গণজাগরণ মঞ্চ কিংবা কোটা আন্দোলনের মতো কোনো ফাঁদে না পড়ে।”

“শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের সংগঠন একাত্মতা প্রকাশ করছে। তাদের সঙ্গে আছি। কিন্তু তারা যেন কারও ফাঁদে না পড়ে” -বলেন এক সময়ের দাপুটে নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন।

তিনি আরও বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে বলেছি, এক ইলিয়াস কাঞ্চনে হবে না, হাজার হাজার ইলিয়াস কাঞ্চন হতে হবে। আজকে লাখ লাখ ইলিয়াস কাঞ্চন রাস্তায়।”

“তাদের যে স্লোগান, এটা তো আমারই কথা। আমি কি ড্রাইভিং লাইসেন্সের কথা বলিনি? আমি কি একদিন ফিটনেসের কথা বলিনি? আমি বলেছি, কেউ এগিয়ে আসেনি। আজ ছাত্ররা এসেছে এসব দাবি নিয়ে।”বলেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের চেয়ারম্যান।

উল্লেখ্য, গত রোববার (২৯ জুলাই) দুপুরে বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনার বিষয়ে সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকরা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি হিসেবে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এসময় তিনি হেসে হেসে এই বিষয়ে দায়ীদের শাস্তির কথা জানানোর পাশাপাশি এই দুর্ঘটনার সঙ্গে ভারতের মহারাষ্ট্রে এক সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩ জন নিহত হওয়ার তুলনা করেন।  

পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের নেতা হিসেবে নৌমন্ত্রীর প্রশ্রয়ে বাসের চালক ও হেলপাররা স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠছে- এমন অভিযোগে শাজাহান খান হেসে হেসে বলেন, “আজকের বিষয়ের সঙ্গে এটি রিলেটেড নয়। মহারাষ্ট্রে এক দুর্ঘটনায় ৩৩ জন নিহত হলেও কোনও হৈ চৈ হয় না। অথচ বাংলাদেশে সামান্য কিছুতেই হই চই হয়।”

গত ২৯ জুলাই শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী মারা গেলে তার সহপাঠীরা এর বিচার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে। এরপর, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা সেই আন্দোলনে যোগ দেয়।

মুস্তাঈন