জাপান সরকার ২০২৯ সালের মার্চের মধ্যে এসএসডব্লিউ’র আওতায় ৮ লাখ ২০ হাজার বিদেশি কর্মী নিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশ সঠিকভাবে প্রস্তুতি নিতে পারলে এই চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ ৩ লাখের বেশি কর্মী পাঠানো সম্ভব।

এর আগে এ ক্যাটাগরির মাত্র ছয়টি খাতে জনশক্তি পাঠানোর সক্ষমতা ছিল বাংলাদেশের। বর্তমানে সব খাতেই দক্ষ কর্মী তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জাপান বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার। দক্ষ কর্মী তৈরি করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় সুযোগ তৈরি হবে। তিনি আরও বলেন, জাপানে কাজ করতে হলে ভাষা দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান অপরিহার্য, যা দেশটির সমাজে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক।

টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাপান ২০২৯ সালের মধ্যে দক্ষতা উন্নয়নভিত্তিক কর্মসংস্থান (ইএসডি) ও এসএসডব্লিউ মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ বিদেশি কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। দীর্ঘমেয়াদে ২০৪০ সালের মধ্যে দেশটিতে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের শর্ত পূরণ করতে পারলে ভবিষ্যতে দেশটির মোট চাহিদার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত জনশক্তি বাংলাদেশ থেকে পাঠানো সম্ভব।

এ লক্ষ্যে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। কর্মীদের জাপানি ভাষা, সংস্কৃতি, আইন ও কারিগরি দক্ষতায় প্রশিক্ষণ দিতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভাষা শিক্ষাকেন্দ্রের মানোন্নয়ন, প্রশিক্ষক উন্নয়ন, জাপানি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্কিল ট্রেনিংয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর অধীনে দেশের ৫৩টি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে জাপানি ভাষা শিক্ষা চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৫টি কেন্দ্রে অনলাইন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি খাতে ২০০টির বেশি ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র কার্যক্রম চালাচ্ছে। বর্তমানে জাপানে কর্মী পাঠানোর জন্য ৯৫টি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্ট রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নেপাল, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও সক্রিয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।

সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকেও এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে বিশেষ উপদেষ্টা ও সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ে ‘জাপান সেল’ গঠন, কাঠামোগত অন্তর্ভুক্তি, জনবল বৃদ্ধি এবং পৃথক ওয়েবসাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং শক্তিশালী করতে অতিরিক্ত জনবলও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাতে স্থানীয় চাহিদা বুঝে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায়।

শুধু কর্মী নয়, শিক্ষার্থী পাঠাতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালে ৪ হাজার শিক্ষার্থী জাপানে গেলেও ২০২৬ সালে এ সংখ্যা ১০ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ শর্তে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা চালু করা হয়েছে। জাপানে শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করার সুযোগ পাবে।

এছাড়া রিক্রুটিং এজেন্টদের জন্য পূর্বের ১৫ লাখ টাকা জমা রাখার শর্তও বাতিল করা হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাপানের শ্রমবাজারে প্রবেশ সহজ করতে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, সহজ ঋণ সুবিধা এবং আগের জটিল নীতিমালা সংশোধনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জাপানে ভালো আয়, সামাজিক নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশ থাকায় দেশটি বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠছে। ফলে দক্ষতা ও ভাষা প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়ে এই সুযোগ কাজে লাগাতে কাজ করছে সরকার।