রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ৩ বছর পরও ৫ ইস্যুর এখনও সুরাহা হয়নি বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। ইস্যুগুলো হলো- নিখোঁজ শ্রমিকদের সংখ্যা, আহত শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, বেকারত্ব, ক্ষতিপূরণ ও দোষীদের বিচার না হওয়া।

গতকাল ‘রানা প্লাজা দিবস’ উপলক্ষে ‘রি ইমার্জিং ফ্রম রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি: অ্যান অ্যাকাউন্ট অন দ্য থার্ড এনিভারসারি’ শীর্ষক সংলাপে সিপিডি প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সিপিডি ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।

এতে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, স্পেন, সুইডেন ও নরওয়ের রাষ্ট্রদূতসহ আইএলও, অ্যাকর্ড, ও অ্যালায়েন্স প্রতিনিধিরা। এ ছাড়া সিপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অ্যাডিশনাল রিসার্চ ডিরেক্টর ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

বক্তারা বলেন, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের অনুদান দেয়া হয়েছে। কিন্তু ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি। তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য একটি কাঠামো তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, শ্রমিক শ্রেণিকে মালিকানার সহযোগী বা অংশীদার করা প্রয়োজন, বাড়াতে হবে প্রতিষ্ঠানের পরিবীক্ষণ কাঠামোতে নজরদারি।

তা ছাড়া ৫ ডলারের পোশাক দেশের বাইরে ২৫ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। এর মাঝখানে কারা কাজ করছেন, সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। শ্রমিকরা সে লাভ পাচ্ছে না। যারা পাচ্ছে, তাদের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। সস্তায় শ্রম পেতে চাপ দিলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, মালিকানায় অংশীদারিত্বের ভূমিকায় রাখতে হবে শ্রমিকদের।

কেন এ ক্ষতিপূরণ পাওয়া-না পাওয়ার ভোগান্তি সইবেন তারা? তারা মালিকানার অংশীদারিত্ব থেকে নিজেদের অধিকার যেন পান। গ্লোবাল মার্কেট ডায়নামিকস যেন এমন ঘটনার জন্য আর দায়ী না হয়। তিনি বলেন, শুধু সরকার বা প্রশাসন বা কারখানার মালিক কেউই একা সব ব্যবস্থা নিতে পারে না। সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সরকার, সিভিল সোসাইটি, স্টেকহোল্ডার, শ্রমজীবী, বায়ার- কারও এ গণ্ডির বাইরে থাকার সুযোগ নেই।

সংলাপে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেন, এ দেশে অনেক ভালো পোশাক কারখানা আছে। কিন্তু কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে মানুষ সেই দুর্ঘটনার কথাই সবাই বলে। ভালো পোশাক কারখানার কথা বলবে না। তাই অনিরাপদ একটি পোশাক কারখানাও দেশের পোশাক খাতের জন্য ঝুঁকি।

বার্নিকাট বলেন, পোশাক কারখানার সার্বিক মান নিশ্চিত করলে উৎপাদনশীলতা বাড়ে। এটা ব্যবসায়িক দিক দিয়েও লাভজনক এবং তা পরিসংখ্যানগতভাবে প্রমাণিত। বাংলাদেশের পোশাক খাতের উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে উল্লেখ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, কারখানা সংস্কার ও কর্মপরিবেশের উন্নয়নে বাংলাদেশ নেতৃত্ব পর্যায়ে আছে।

আশা করি, বাংলাদেশ এটা ধরে রাখতে পারবে এবং প্রতিযোগিতায় সক্ষম থাকবে। তিনি বলেন, সস্তা শ্রম নয়, শ্রমিকদের কাজের নৈপুণ্যে যে পোশাক তৈরি হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী সেটার জনপ্রিয়তার কারণেই তৈরি পোশাক খাতের বিস্তার হয়েছে। যে কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের সঙ্গে আছে এবং থাকবে।

কারখানা পরিদর্শনে আসা ক্রেতাদের দুটি সংগঠন অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্স বাংলাদেশে কতদিন তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে এমন তর্কে নিজ দেশের অবস্থান তুলে ধরে বার্নিকাট বলেন, অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্সের অবদান প্রথম দিকে বোঝা না গেলেও, এখন এটার ফল পাওয়া যাচ্ছে। কারণ, তারা গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করেছে।

রানা প্লাজা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রানা প্লাজার মতো একটি খারাপ ঘটনা পুরো খাতকে কলঙ্কিত করে। কিন্তু এর পরও তো অনেক ভালো কারখানা রয়েছে বাংলাদেশে।

নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত লিওনি মার্গারেথ বলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে আদর্শিক ও ভালো কারখানাগুলোর বেশ কয়েকটি বাংলাদেশে অবস্থিত। তবে বিশ্বব্যাপী এটির খুব একটা প্রচারণা নেই। রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর সবর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে।

সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, গত তিন বছরে হালনাগাদ তথ্য নিয়ে এবারের প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ৫টি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নিখোঁজ শ্রমিক, আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা, পুনঃকর্মসংস্থান, আইনি পরিস্থিতি ও আর্থিক সহায়তার বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

সংলাপে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব বাবুল আক্তার বলেন, বাংলাদেশের আইনে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ খুবই কম। তার পরও বিভিন্ন উৎস থেকে শ্রমিকরা আর্থিক সাহায্য পেয়েছেন। কিন্তু সেটা ক্ষতিপূরণ নয়।

যাদের কাছ থেকে আইনগতভাবে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা, তাদের কাছ থেকে শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণ পাননি। সরকার তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে শ্রমিকদের দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, নিহত শ্রমিকরা বেঁচে গেছেন। আর যারা আহত হয়েছেন, তাদের প্রতিদিনই যন্ত্রণার মধ্যে থাকতে হয়। আহতদের চিকিৎসা নেয়ার জন্য প্রতিদিনই ছোটাছুটি করতে হয়। এর ফলে অন্য পেশায়ও যাওয়ার সুযোগ হয় না। সরকারের উচিত, যারা আহত হয়েছেন তাদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

মানবাধিকার কর্মী ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন বলেন, ক্ষতিপূরণ অধিকার, নাকি ক্ষতির পূরণ- সেটি নিয়ে আইনি আলোচনা চলছে। এ ছাড়া এমন ঘটনায় দায়ী কারা- মালিক, নাকি স্থানীয় প্রশাসন, নাকি ব্র্যান্ডগুলো- সেটিও আলোচনায় আসছে। তিনি বলেন, শুধু গার্মেন্ট শ্রমিক নয়, সব শ্রমিকের জন্য ব্যবস্থা রাখতে হবে। শ্রমিকদের জন্য বীমাব্যবস্থা এবং লেবার ওয়েলফেয়ার ফান্ড থাকা উচিত।

প্রতিবেদনে সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর ৩ হাজার ৬৩২টি কারখানা পরিদর্শন করা হয়েছে। তবে এখনও একটি বড় অংশ পরিদর্শনের বাইরে রয়েছে। এর সংখ্যা ৯০৯টি।

সংলাপে উপস্থিত শ্রমিক নেতারা বরাবরের মতোই পোশাক খাতে ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। তারা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের এ যাবৎকালে যতটা অর্থ সহযোগিতা দেয়া হয়েছে, তার পুরোটাই কোনো না কোনো ক্রেতা গোষ্ঠী বা সংস্থার অনুদান বা সাহায্য।

প্রকৃত অর্থে এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি। এই ক্ষতিপূরণ কার কাছ থেকে কীভাবে আদায় করা হবে তার একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা চান তারা। একই সঙ্গে রানা প্লাজাসহ গার্মেন্ট খাতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় আহতদের সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত সুচিকিৎসা ও যারা সুস্থ হয়ে উঠেছেন তাদের কর্মসংস্থানের দাবি জানান তারা।


উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল সকালে ধসে পড়ে সাভারের রানা প্লাজা; সেখানে ৫টি পোশাক কারখানা ছিল। এতে অন্তত ১ হাজার ১৩৫ জন নিহত হন। এ ঘটনাটি সারা বিশ্বে ভবন ধসে সবচেয়ে বড় প্রাণহানির ঘটনা।

এমআর