যশোর বিএনপির কয়েক হাজার নেতাকর্মী এবার ঈদ পালন করতে পারছেন না। গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। গত ১ অক্টোবর একটি মানববন্ধন কর্মসূচিতে পুলিশের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তারা আসামি হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যাদের নামে সুনির্দিষ্ট মামলা হয়নি তারাও আতঙ্কে আছেন ‘অজ্ঞাত আসামির’ মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার।

প্রায় একই অবস্থা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের। এই দলের জেলা সেক্রেটারিসহ সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নামে এক বা একাধিক মামলা থাকায় তারা ফেরার জীবনযাপন করছেন। দলের বিভিন্ন স্তরের ৩৮ নেতাকর্মী রয়েছেন কারাগারে।

দল দুটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে সরকারের নির্দেশে স্থানীয় পুলিশ তাদের চরমভাবে নির্যাতন ও হয়রানি করছে। কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তা অতি উৎসাহী হয়ে বিরোধীদল নিপীড়নে নেমেছেন।

মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর ইসলাম ও মহানবী (স.) সম্পর্কে আপত্তিকর বক্তব্যের প্রতিবাদে গত ১ অক্টোবর যশোর শহরের মুজিব সড়কে প্রেস ক্লাবের সামনে পূর্বনির্ধারিত মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করতে আসে বিএনপি নেতাকর্মীরা। পুলিশি বাধায় এই কর্মসূচি পণ্ড হয়। এমনকি বিনাউস্কানিতে পুলিশ প্রেস ক্লাব ও সামনের রাস্তা থেকে গ্রেফতার করে আটজনকে। গ্রেফতার হওয়াদের মধ্যে দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, যুগ্ম-সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদও রয়েছেন।

বিনা কারণে নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে বিএনপিকর্মীরা রাস্তায় বসে পড়লে পুলিশ বেপরোয়া গুলি ছোড়ে ও লাঠিচার্জ করে। এতে রাজনৈতিক কর্মী ছাড়াও আহত হন সাধারণ দোকানি ও পথচারীরা।

এই ঘটনার ২৮ ঘণ্টা পর কোতয়ালী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আজগার আলী বাদী হয়ে দুটি মামলা করেন। মামলা দুটিতে সুনির্দিষ্ট আসামি করা হয়েছে প্রায় দেড়শ’ জনকে। অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে আরও বহু নেতাকর্মীকে।

জেলার বিভিন্ন উপজেলা এমনকি গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত যারা বিএনপি ও বিভিন্ন সহরেযাগী সংগঠনের নেতৃত্ব দেন, তাদের নাম এজাহারে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এদের মধ্যে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাবেরুল হক সাবু, যুগ্ম-সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ, নগর বিএনপির সভাপতি ও যশোর পৌরসভার মেয়র মারুফুল ইসলাম, সেক্রেটারি মুনির আহমেদ সিদ্দিকী বাচ্চু।

সদর উপজেলা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ নূরুন্নবী, সাধারণ সম্পাদক কাজী আজম, মণিরামপুর পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট শহীদ ইকবাল, কেশবপুর পৌরসভার মেয়র আবদুস সামাদ বিশ্বাস, বাঘারপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান মশিউর রহমান, যশোর পৌরসভার কাউন্সিলর ও জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক হাজী আনিসুর রহমান মুকুল, চৌগাছা উপজেলা কমিটির সভাপতি জহুরুল ইসলাম প্রমুখ রয়েছেন। যদিও এদের বেশিরভাগই উল্লিখিত কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন না।

মামলা হওয়ার পর পরই পূজা-ঈদের ছুটি শুরু হওয়ায় এজাহারভুক্ত আসামিদের কেউ জামিন নিতে পারেননি। পুলিশের ভয়ে তারা আত্মগোপনে চলে গেছেন। অজ্ঞাত আসামির তালিকায় পড়তে পারেন আশঙ্কায় গ্রাম পর্যায়ের নেতাকর্মীরা পর্যন্ত পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ফলে দলটির হাজার হাজার নেতাকর্মী এবার ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

শার্শা উপজেলা বিএনপির সভাপতি খায়রুজ্জামান মধু বলেন, ১ অক্টোবরের ঘটনায় এই উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ ১৩ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। তারাসহ বিএনপির অন্য নেতাকর্মীরা এখন বাড়িছাড়া।

মণিরামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট শহীদ ইকবাল ও তার ভাই মণিরামপুর সদর ইউপি চেয়ারম্যান নিস্তার ফারুক ১ অক্টোবরের ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি।

তারা বলেন, ঘটনার দিন আমরা যশোরে যাইনি। অথচ আমরাসহ মণিরামপুরের বেশ কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে মামলায় আসামি করে হয়রানি করা হচ্ছে।

তবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম আরিফুল হক বলেন, কিছু লোক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালালে পুলিশ ১ অক্টোবর বিকেলে মুজিব সড়কে অ্যাকশনে যায়। এই ঘটনায় যারা যুক্ত ছিল, তাদের বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে।

সামগ্রীক বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম বলেন, মানববন্ধনের মতো নিরীহ কর্মসূচিতে পুলিশ গুলি চালিয়েছে, এমন ঘটনা আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দেখিনি। এই ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। আসামিদের অনেকেই ওই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন না। বিভিন্ন থানার ওসিদের মাধ্যমে নাম সংগ্রহ করে মামলায় আসামি করা হয়েছে। দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা ঈদ-উৎসবও পালন করতে পারেনি।

তিনি বলেন, সরকারকে বিপদে ফেলতে প্রশাসনের কিছু লোক অতি উৎসাহী হয়ে উঠেছে। তারা বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন করে নিজেদের সরকারের বিশ্বস্ত বলে প্রমাণ করতে চাইছে।

তরিকুল ইসলাম পশু কুরবানির মাধ্যমে এই সব সরকারি কর্মচারীর পশুত্ব কুরবানি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

এদিকে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে থেকেই যশোরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতাকর্মীরা রয়েছেন দৌড়ের ওপর। একাধিকবার গ্রেফতার করা হয়েছে দলের জেলা আমির অধ্যাপক আবদুর রশিদকে। শহর আমির গোলাম রসুলসহ ৩৮ জন গুরুত্বপূর্ণ নেতা রয়েছেন কারাগারে।

দীর্ঘদিন পলাতক রয়েছেন জেলা সেক্রেটারি মাস্টার নূরুন নবী, অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলীসহ অনেক নেতাকর্মী। এ সময়কালে অন্তত ৩০ জন নেতাকর্মী পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন। শত শত মামলা করা হয়েছে দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। কারো কারো বিরুদ্ধে মামলার পাহাড় জমে উঠেছে।

প্রকাশ্যে থাকা দলের মধ্যম সারির নেতা জেলা কমিটির প্রচার সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন এসব প্রসঙ্গে বলেন, অবৈধ সরকার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে জামায়াতসহ বিরোধী দলের ওপর জুলুম করছে। দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীর ওপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। এভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সূত্র: দ্য রিপোর্ট

জেএ