টাঙ্গাইল মধুপুর বনে কাইলাকুড়ি স্বাস্থ্য পরিচর্চা কেন্দ্র গড়ে তুলে মানবসেবায় বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন গরিবের ডাক্তারখ্যাত নিউজিল্যান্ডের নাগরিক ডা. এড্রিক এস বেকার।

গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর মৃত্যু হয় তার। তার অবর্তমানে কেমন চলছে চিকিৎসা সেবা। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে কি কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এসব জানতে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বর্তমান আদ্যপান্ত।

ডা. বেকারের শেষ ইচ্ছান অনুযায়ী হাসপাতাল আঙিনায় দীর্ঘদিন বাস করা ঘরের বারান্দায় তাকে সমাহিত করা হয়। বেকারের অবর্তমানে হাসপাতালের দায়িত্ব নিতে মার্কিন চিকিৎসক দম্পতি জেসন ও মেরিন্ডির আসার কথা থাকলেও তারা এখনো আসেননি বলে জানান প্রজেক্ট ম্যানেজার পিজন নংমিন।

তিনি জানান, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে তাদের আসার কথা আছে। কিন্তু চিকিৎসা সেবা অব্যাহতভাবে চলছে। ‍হাসপাতালে বেকারের সহযোগী হিসেবে ৩০ জন প্যারা মেডিকেলসহ সামান্য বেতনে যে ৯০ জন কাজ করতেন তারা এখনো রয়েছেন।

আগের মতোই দৈনিক ১২০ জন রোগীকে আউটডোরে সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও দেড় শতাধিক রোগীকে সেবা দিতে হয়। আর হাসপাতালে ৪০ জন রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেন।

প্রজেক্টভুক্ত এলাকার ২২ গ্রামের ০-৪ বছর বয়সী শিশুরা এ সেবা সেন্টারের গ্রোথ মনিটরিংয়ের আওতায় থাকে। এমন শিশুর সংখ্যা বর্তমানে ১ হাজার ৩০০ জন। প্রজেক্ট এরিয়ার গর্ভবতী মায়েরাও থাকেন নিবিড় চিকিৎসা সেবার আওতায়। তাদের সংখ্যা ১৫০।

বেকারের মৃত্যুর পর গণস্বাস্থ্য মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর প্রতিশ্রুতি মতো দুইজন করে নবীন মেডিকেল শিক্ষার্থী দুই মাসের জন্য এখানে এসে ইন্টার্নশিপ করছেন। বর্তমানে ডা. রাকিব ও ডা. তারিফ অবস্থান করছেন এ সেবা কেন্দ্রে।

হাসপাতালের রেজিস্ট্রি খাতায় দেখা যায়, আউটডোর থেকে গত ২৩ আগস্ট ১৩১, ২৫ আগস্ট ১০৫ ও ২৭ আগস্ট ১২০ জন রোগী সেবা নিয়েছেন। সেবা গ্রহীতারা প্রজেক্ট এরিয়ার ২২ গ্রামের কেউ হলে নতুন হিসেবে ১৫ টাকা ও পুরাতন হলে ১০ টাকা ফি দিয়ে সেবা নেন।

বাইরে থেকে আসা রোগীদের জন্য এ মূল্য যথাক্রমে ২৫ ও ১৫ টাকা। নিতান্তই অসহায় হলে তাকে কোনো ফি দিতে হয় না।

ডা. বেকার ১৯৮৩ সালে বেড়াতে এসে মধুপুরের গভীর বনের থানার বাইদ এলাকায় বনবাসীদের চিকিৎসা সেবা দিতে ক্লিনিক খুলে বিমামূল্যে সেবা দিতে শুরু করেন। সাধারণ মানুষের ভালোবাসা আর রোগীর সেবা করতে গিয়ে আটকে যান ডা. বেকার। আর ফেরা হয়নি নিজ দেশে।

তবে নিজ দেশসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে তার হাসপাতাল ও রোগীর জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। পরে ২০০৪ সালে থানারবাইদ থেকে কাইলাকুড়িতে গিয়ে গড়ে তোলেন কাইলাকুড়ি স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্র। ডায়াবেটিস, টিবি, স্বাভাবিক ডেলিভারি, পুষ্টিহীনতা, উচ্চ রক্তচাপ, মৃগী, হৃদরোগ, কিডনি সমস্যাসহ ‍মা- শিশু যত্ন, হাঁপানিসহ নানা রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করেন তিনি।

পিজন নংমিন জানান, এ প্রজেক্টটি নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, আমেরিকা ও জাপানের সাহায্যে চলে। জাপানি বেশকিছু নাগরিক ব্যক্তিগতভাবে অর্থ দেন। বেকারের নিজ দেশ নিউজিল্যান্ডে গড়ে ওঠা ‘কাইলাকুড়ি লিংক গ্রুপ’ আরো নানা উৎস থেকে অর্থ তুলে পাঠান। এছাড়া প্রজেক্ট এরিয়ার ২২ গ্রামের বাড়ি-বাড়ি ডা. বেকারের চালু করা মাটির ব্যাংক থেকেও অর্থ আসে।

ইন্টারন্যাশনাল করেসপন্ডেন্ট ও ফান্ড রাইজার কনসালট্যান্ট নাদিন বিকার্স এটি দেখাভাল করেন। তিনি জানান, গত ৯ জুলাই ‘আলোকিত মধুপুর’ ফেসবুক গ্রুপ নামে এক সংগঠন প্রজেক্টের গৃহ নির্মাণে দেশ বিদেশ থেকে সংগ্রহ করা ১ লাখ ৫০ হাজার ১৩০ টাকা প্রদান করেছে।

বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন ডা. বেকার। তার মৃত্যুতে মধুপুরের ‍মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

এমএনজে