পদ্মা নদীর অব্যাহত ভাঙনে রাজশাহী সীমান্তে বদলে যাচ্ছে জনপদের চেহারা। আর ভূখ- হারাচ্ছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে দুর্যোগ-দুর্বিপাকে জীবন কাটছে ভাঙন কবলিত মানুষের। তাদের পাশে দাঁড়ানোর যেন কেউ নেই। একদিকে যখন নির্বিকার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। অন্যদিকে তখন হারানো ভূখন্ডের উপর মালিকানা প্রতিষ্ঠায় তৎপর হয়েছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বিএসএফ।
গত কয়েক বছর যাবত এই পরিস্থিতি চললেও এবার তা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। শত শত মানুষ নিঃস্ব হয়ে গেছেন পদ্মার ভাঙনে। দিশেহারা হয়ে অনেকেই ছুটছেন নিরাপদ আশ্রয়ে। অনেকেই আবার নিরুপায় হয়ে আঁকড়ে ধরে আছেন বাপ-দাদার বিপন্ন ভিটা। কিন্তু তাদের রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। এদিকে ওই এলাকায় দেশের ভূ-খ- পদ্মায় বিলীন হয়ে যাওয়ায় মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছ ভারতের। এরমধ্যেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ওই এলাকায় বাংলাদেশী জেলেদের মাছ ধরতে বাধা দিতে শুরু করেছে। জানা গেছে, বর্তমানে রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের চর খিদিরপুর ও খানপুর এলাকায় পদ্মায় ফের ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত বর্ষায় পদ্মা নদীর দক্ষিণ সীমান্তের ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৫০০ মিটার প্রস্থ ভূখ- পদ্মায় হারিয়েছে বাংলাদেশ। ওই ভাঙনে চরমাঝাড়দিয়াঢ় ও চরখানপুরের মধ্যবর্তী কলাবাগান এলাকার ১৬৪ নম্বর মেইন পিলার থেকে ১৬৫ নম্বর মেইন পিলার পর্যন্ত বাংলাদেশের ভূখ- নদীতে বিলীন হয়ে ভারতীয় সীমানায় মিশেছে। এরপর থেকেই পদ্মার ওই অংশে বিএসএফ নিজেদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করতে তৎপর হয়ে ওঠে। প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে ভারতের মোহনগঞ্জ থেকে বিএসএফ তাদের ক্যাম্প এনে নদীর তীরে স্থাপন করে। এবারও ভাঙন অব্যাহত থাকলে দেশের আরও ভূখ- ভারতের অধীনে চলে যেতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। ভাঙনের মুখে চরের বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ভেঙে আগেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। অনেকে চলে আসছেন শহরে। চর থেকে ভাঙনের মুখে চলে আসা কয়েকজন জানান, বেশ কয়েকদিন ধরেই পদ্মায় ভাঙন শুরু হয়েছে। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন রোধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। একজন জনপ্রতিনিধি জানান, ভারতীয় সীমানা ঘেরা চরখিদিরপুর, তারানগর ও খানপুর নামে তিনটি গ্রাম ছিল। এর আয়তন ছিল ১ হাজার ৯৪২ হেক্টর। নদীর ভাঙনে ছোট হতে হতে গত বছর এর আয়তন এসে দাঁড়ায় ১৮৭ হেক্টরে। তাতে শ’দেড়েক পরিবার রয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের বাড়ি ভাঙা শুরু হয়ে গেছে। গ্রামের দুই মাথার দুই সীমান্ত পিলার ইতোমধ্যেই নদীতে নেমে গেছে। এখন গ্রামের মাঝ বরাবর ১৬২/২-এস ও ১৬১/১-এস দুুটি পিলার রয়েছে। এই পিলার দুটিতে নদী পৌঁছলেই তার ইউনিয়নে পদ্মা নদীর দক্ষিণ তীরে বাংলাদেশের মাটি থাকবে না। ভাঙন অব্যাহত থাকলে কয়েকদিনের মধ্যেই পদ্মা নদী ওই দু’টি পিলারে গিয়ে ঠেকবে। এছাড়া, পদ্মার ওই এলাকায় বিএসএফের বাধায় বাংলাদেশী জেলেরা আর মাছ ধরতে পারছে না। হরিয়ান ইউপির একজন সদস্য জানান, গ্রামে পুব-পশ্চিম দুই মাথা ভেঙে ভারতের সীমানার সঙ্গে মিশে গেছে। এখন কোনটা ভারতের জলসীমা আর কোনটা বাংলাদেশের জলসীমা জেলেরা তা নির্ধারণ করতে পারছে না। ২৮ জুলাই মাছ ধরতে গেলে বিএসএফ ৩৫টি মাছধরা নৌকা আটক করে বিজিবির জিম্মায় দিয়েছে। গ্রামের মানুষ এখন কী খাবে, কোথায় যাবে- এ নিয়ে মহাসংকট হচ্ছে। এদিকে গত ২৫ জুলাই জেলার উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় এলাকাটি সংরক্ষণের জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এলাকাটি সংরক্ষণের জন্য কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, দুই বছর আগে এই এলাকা রক্ষা করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ১ কোটি ৬৮ লাখ এবং ৬৩ লাখ টাকার দু’টি প্রকল্প হাতে নেয়। তীব্র ভাঙনের মুখে কাজের শেষ পর্যায়ে এসে তারা প্রকল্প দুটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। এর পেছনে অর্থ ব্যয় করার কোন যৌক্তিকতা খুব একটা নেই বলে তারা পিছু হটে।
এসএ/টাইম





